Friday, May 26, 2017

তারাবীর নামাযের বয়ান


তারাবীহ তারাবীহ শব্দের বহুবচন। তার অর্থ বিশ্রামের জন্যে একটুখানি বসা। পরিভাষায় তার অর্থ হলো রমযানুল মুবারকে রাতে যে সুন্নাত নামায পড়া হয় তার চার রাকায়াত পর পর বিশ্রামের জন্য বসা। যেহেতু ঐ বিশ রাকায়াত নামাযে পাঁচটি তারাবীহ করা হয়, সে জন্যে এ সুন্নাত নামাযকে তারাবীহ বলা হয়ে থাকে।
তারাবীর নামাযের হুকুম
তারাবীর নামায সুন্নাতে মুয়াক্কাদাহ। নবী (স) তার বিশেষ ব্যবস্থাপনা করেছেন এবং সাহাবায়ে কেরাম (রা)ও। যে ব্যক্তি বিনা ওজরে তারাবীহ পরিত্যাগ করবে সে গোনাহগার হবে। এ নারী পুরুষ উভয়ের জন্যে সুন্নাতে মুয়াক্কাদাহ। তারপর এটাও মনে রাখতে হবে, তারাবীহ নামায রোযার অধীন নয়। অর্থাৎ এরূপ মনে করা ভুল যে, তারাবীহ পড়া জরুরী যদি সেদিন রোযা রাখা হয়। এ দুটি পৃথক পৃথক ইবাদত। যারা কোনো ওজর বা অক্ষমতার কারণে রোযা রাখতে পারে না। যেমন কেউ রোগী অথবা সফরে রয়েছে, অথবা রোযা রাখেনি, অথবা মেয়ে মানুষ হায়েয নেফাসের কারণে রোযা রাখেনি কিন্তু তারাবীর সময় পাক হয়ে গেছে- তাদের তারাবীহ পড়া উচিত। না পড়লে সুন্নাত পরিত্যাগ করার গোনাহ অপরিহার্য হবে।
তারাবীহ নামাযের ফযিলত
নবী (স) শাবান মাসের শেষ দিন রমযান মাসের আগমনীকে খোশ আমদেদ জানিয়ে গুরুত্বপূর্ণ ভাষণ দেনে। তিনি বলেন, এ মাসে একটি রাত এমন আছে যা এক হাজার মাস অপেক্ষা উৎকৃষ্ট। এ মাসে রাতের বেলায় আল্লাহ তায়ালা তারাবীহ নামায পড়া নফল করে দিয়েছেন। (অর্থাৎ ফরয নয়, সুন্নাত। এজন্যে যে ফরযের মুকাবেলায় সুন্নাত মুস্তাহাব সবকেই নফল বলা হয়।) যে ব্যক্তি এ মাসে কোনো কাজ স্বেচ্ছায় ও সন্তুষ্টি সহকারে করবে, তার প্রতিদান ও সওয়াব এতো হবে- যতোটা অন্যান্য মাসের ফরয ইবাদাতের হয়। (মিশকাত-বর্ণনাকারী সালমান ফারসী (র)। এ এক দীর্ঘ বর্ণনা। এখানে কিছুটা অংশ নকল করা হয়েছে।)
নবী (স) আর একটি হাদীসে একে মাগফেরাতের উপায় হিসেবে বর্ণনা করেছেন। তিনি বলেনঃ যে ব্যক্তি রমযানের রাতগুলোতে ঈমানী প্রেরণা এবং আখিরাতের প্রতিদানের নিয়তে তারাবীহ নামায পড়লো, তার কৃত সকল গোনাহ মাফ করে  দেয়া হবে। (বুখারী, মুসলিম)
তারাবীহ নামাযের সময়
যে রাতে রমযানের চাঁদ দেখা যাবে সে রাত থেকে তারাবীহ শুরু হয়। ঈদুল ফিতরের চাঁদ দেখা গেলে তারাবীহ বন্ধ হয়ে যায়। তারাবীহ নামাযের সময় এশার নামাযের পর থেকে শুরু হয় এবং ফজরের সময় হওয়ার পূর্ব পর্যন্ত থাকে। যদি কেউ এশার নামাযের পূর্বে তারাবীহ পড়ে তাহলে তারাবীহ হবে না। যদি কেউ এশার নামাযের পর তারাবীহ পড়ে এবং কোনো কারণে এশার নামায পুনরায় পড়তে হয়, তাহলে তারাবীহ পুনরায় পড়তে হবে। (দুররে মুখতার)
অবশ্যই এক তৃতীয়াংশ রাতের পর মধ্যে রাতের আগেই তারাবীর নামায পড়া মুস্তাহাব। মধ্য রাতের পর পড়া জায়েয হলেও আগেভাগে পড়ার যে নীতি তার খেলাপ হবে। (তারাবীর উৎকৃষ্ট সময় কোনটি এ প্রশ্নের জবাব দিতে গিয়ে আল্লামা সাইয়েদ আবুল আলা মওদূদী (র) বড়ো গুরুত্বপূর্ণ যুক্তি পেশ করেন। তিনি বলেনঃ এ ব্যাপারে মতভেদ আছে যে, তারাবীর উৎকৃষ্ট সময় কোনটা। এশার সময়, না তাহাজ্জুদের সময়? উভয়ের সপক্ষে যুক্তি রয়েছে। কিন্তু বেশী আগ্রহ দেখা যায় শেষ সময়ের দিকে। কিন্তু প্রথমে সময়কে প্রাধান্য দেয়ার জন্য গুরুত্বপূর্ণ যুক্তি এই যে, মুসলমানগণ সমষ্টিগতভাবে প্রথম সময়েই তারাবীহ পড়তে পারে। শেষ ময় অবলম্বন করা হলে উম্মতের বিরাট সংখ্যা গরিষ্ঠ এ সওয়াব থেকে বঞ্চিত রয়ে যাবে এবং তা বিরাট ক্ষতির বিষয় হবে। যদি কিছু নেক লোক শেষ সময়ের ফযিলত লাভের উদ্দেশ্যে প্রথম ওয়াক্তের জামাতে শরীক না হয়, তাহলে এ আশংকা হতে পারে যে, জনসাধারণ হয়তো এসব নেক লোকের প্রতি বিরূপ মনোভাব পোষণ করবে অথবা তাদের জামায়াতে শরীক না হওয়ার কারণে জনসাধারণ নিজেরাই তারাবীহ পড়া ছেড়ে দেবে। অথবা ঐসব নেক রোকদেরকে তাদের তাহাজ্জুদ পড়ার ঢাক ঢোল পেটাতে হবে। (রাসায়েল ও মাসায়েল, তৃতীয় খন্ড, ২৩১ পৃঃ)
তারাবীহ নামাযের জামায়াত
নবী (স) রমযানে তিন রাত ২৩, ২৫ এবং ২৭শে রাত তারাবীহ নামায জামায়াতে পড়িয়েছেন। তারপর যখন তিনি সাহাবীদের মধ্যে বিরাট উৎসাহ উদ্দীপনা ও অনুরাগ লক্ষ্য করলেন তখন মসজিদে এলেন না। সাহাবায়ে কেরাম (রা) মনে করলেন তিনি বোধ হয় ঘুমিয়ে পড়েছেন। তখন তারা তার দরজায় আওয়াজ দিতে লাগলেন। তখন তিনি বলেন, আল্লাহ তোমাদের উৎসাহ উদ্দীপনায় আরও বরকত দিন। আমি এ আশংকায় বাইরে যাইনি যে, কি জানি এ নামায তোমাদের ওপর ফরয হয়ে না যায় এবং হামেশা তোমরা তা পালন করতে না পার। এ জন্যে তোমরা এ নামায ঘরেই পড়তে থাক, কারণ নফল নামায ঘরে পড়াতে বেশী সওয়াব ও বরকতের কারণ হয়। (বুখারী)
এ হাদীস থেকে এতোটুকু প্রমাণিত হয় যে, স্বয়ং নবী পাক (স) তিন রাত জামায়াতে তারাবি পড়িয়েছেন। অবশেষে দ্বিতীয় খলীফা হযরত ওমর (রা) রীতিমতো তার জামায়াত কায়েম করেন এবং সাহাবায়ে কেরাম নতশিরে তা মেনে নেন। পরবর্তীকালে কোনো খলীফাই এ সুন্নাতের বিরোধিতা করেননি। এ জন্যে আলেম সমাজ এ জামায়াতকে সুন্নাতে মুয়াককাদাহ কেফায়া বলেছেন। (তারাবীর নামাযের জামায়াত সম্পর্কে এক ব্যক্তি আল্লামা সাইয়েদ আবুল আলা মওদূদী (র) কে প্রশ্ন করেন। তিনি বিশদভাবে তার জবাব দেন এবং বিষয়টির ওপর ভালোভাবে আলোচনা করেন। নিম্নে প্রশ্ন ও তার জবাব দেয়া হলোঃ
প্রশ্নঃ ওলামায়ে কেরাম সাধারণত বলে থাকেন যে, তারাবীহ আউয়াল ওয়াক্তে (এশার সাথে) পড়া ভালো এবং তারাবীহ জামায়াত সুন্নাতে মুয়াক্কাদাহ কেফায়া। অর্থাৎ যদি কোনো মহল্লায় জামায়াতসহ তারাবীহ পড়া না হয়, তাহলে মহল্লাবাসী গোনাহগার হবে। আর যদি দুজন মিলেও মসজিদে তারাবীহ পড়ে তাহলে সকলের পক্ষ থেকে জামায়াত ত্যাগের গুনাহ মাফ হয়ে যাবে। একথা কি ঠিক? যদি তাই হয়। তাহলে হযরত আবু বকর (রা) এর যামানায় কেন তা হয়নি? তাহলে সে সময়ের মুসলমানদের ওপর কি হুকুম হবে? জামায়াত সহ তারাবীহ না পড়ার কারণে তারা কি গোনাহগার ছিলেন?
জবাবঃ নবী (স) এর যামানা থেকে শুরু করে হযরত ওমর (রা) এর প্রাথমিক কার পর্যন্ত রীতিমতো এক জামায়াতে সকল লোকের তারাবীহ পড়ার পদ্ধতি প্রচলিত ছিল না। বরঞ্চ লোক হয়তোবা আপন আপন ঘরে পড়তো কিংবা মসজিদে আলাদা আলাদাভাবে ছোট ছোট জামাত করে পড়তো। হযরত ওমর (রা) যা কিচু করেন তাহলো এই যে, এ বিচ্ছিন্নতা দূর করে সকলকে একটি জামায়াতের আকারে নামায পড়ার হুকুম দেন। তার জন্যে হযরত ওমর (রা) এর নিকটে এ অকাট্য যুক্তি ছিল যে, নবী (স) এর ধারাবাহিকতা একথা বলে বন্ধ করে দেন যে, তা কোনো দিন ফরয না হয়ে যায়। তারপর নবী (সা) এর অতীত হওয়ার পর এ আশংকা আর রইলো না যে, কোনো কাজের দ্বারা এ জিনিস ফরয বলে গণ্য হবে। এ জন্যে হযরত ওমর (রা) সুন্নাত হিসেবে তা জারী করেন। এ ছিল হযরত ওমর (রা) এর দীন সম্পর্কে গভীর প্রজ্ঞার এক অন্যমত উজ্জ্বল দৃষ্টান্ত যে, তিনি শরীয়ত প্রণেতার উদ্দেশ্যে সঠিকভাবে বুঝতে পেরেছিলেন যার ফলে তিনি উম্মতের মধ্যে একটা সঠিক তরীকা প্রচলিত করে দেন। সাহাবায়ে কেরাম (রা) এর মধ্যে কারো এ বিষয়ে আপত্তি উত্থাপন না করা, বরঞ্চ তা নতশিরে মেনে নেয়া একথাই প্রমাণ করে যে, তিনি শরীয়াত প্রণেতার উদ্দেশ্যে সঠিকভাবেই পূরণ করেছেন যে, তাকে যেন ফরযের অন্তর্ভুক্ত করে দেয়া না হয়।
অন্ততপক্ষে একবার তো তার তারাবীতে শরীক না হওয়ার প্রমাণ রয়েছে। একবার তিনি আবদুর রহমান বিন আবদের সাথে বাইরে বের হয়ে মসজিদে লোকদেরকে তারাবীহ পড়তে দেখে তার প্রশংসা করেন। যার ভিত্তিতে আলেম সমাজ একথা বলেন যে, যে বস্তিতে মোটেই তারাবীর নামায জামায়াতসহ পড়া হয় না সে মহল্লায় সকল লোক গুনাহগার হবে, তাহলে এই যে, তারাবীহ ইসলামের এমন একটি সুন্নাত যা খেলাফতে রাশেদার যুগ থেকে গোটা উম্মতের মধ্য প্রচলিত আছে, ইসলামের এমন এক পদ্ধতি পরিত্যাগ করা এবং বস্তির সব লোক মিলে পরিত্যাগ করা দীন থেকে বেপরোয়া হওয়ার আলম। তা যদি মেনে নেয়া যায় তাহলে ক্রমশ তার থেকে ইসলামের সকল রীতি পদ্ধতি মিটে যাওয়ার আশংকা রয়েছে।)
তারাবীহ নামাযের রাকায়াতসমূহ
সাহাবীগণের ইজমা থেকে প্রমাণিত যে, তারাবীহ নামায বিশ রাকায়াত। বিশ রাকায়াত এভাবে পড়তে হবে যে, দু দু রাকায়াতের পর সালাম ফিরাতে হবে এবং প্রত্যেক চার  রাকায়াত পর বিশ্রামের জন্যে এতোটা সময় বসতে হবে যতোটা সময়ে চার রাকায়াত পড়া যায়। বিশ্রামের জন্যে এতোটুকু সময় বসা মুস্তাহাব। তবে যদি অনুভব করা হয় যে, মুক্তাদীগণ এতক্ষণ বসতে পেরেশানি বোধ করেন তাহলে ততোক্ষণ না বসা ভালো। এ ব্যাপারে মুক্তাদীদের ভাবাবেগের প্রতি খেয়াল রাখা উচিত।
আহলে হাদীসের মতে আট রাকায়াত তারাবীহ পড়া সুন্নাত। তাদের মতে বিশ রাকায়াত পড়া সুন্নাত থেকে প্রমাণিত নয়।তাদের মতে অধিকাংশ রেওয়াতের আট রাকায়াতের এবং হযরত আবদুল্লাহ বিন আব্বাস (রা) এর যে রেওয়ায়েতে বিশ রাকায়াতের কথা বলা হয়েছে তা অন্যান্য হাদিসগুলোর তুলনায় দুর্বল। আল্লামা মওদূদী (র) এ বিষয়ে যে অভিমত প্রকাশ করেনে তা নিম্নে দেয়া হলোঃ
হযরত ওমর (রা) এর জামানায় যখন জামাতের সাথে তারাবী পড়ার সিলসিলা শুরু হল তখন সাহাবীগণের সর্বসম্মতিক্রমেই বিশ রাকায়াত পড়া হত। হযরত ওসমান গনী (রা) হযরত আলী (রা) এর জামানায় এ নিয়ম মেনে চলা হত। তিনজন খলীফা এ বিষয় একমত হওয়া এবং এ ব্যাপারে মতবিরোধ না করা এ কথারই প্রমাণ যে, নবী (স) এর যুগ থেকেই লোক বিশ রাকায়াত পড়তেই অভ্যস্ত। এ কারনেই ইমাম আবু হানীফা (র) এবং ইমাম আহমদ ইবনে হাম্বল (র) বিশ রাকাতের পক্ষেই অভিমত ব্যক্ত করেছেন। এর সপক্ষে ইমাম মালেকেরও এর একটি উক্তি পাওয়া যায়। দাইদ যাহেরী (র) একে প্রমাণিত সুন্নাত বলে মেনে নিয়েছে।
হযরত ওমর বিন আবদুল আজীজ (র) এবং আবান ইবনে ওসমান বিশের পরিবর্তে ছত্রিশ রাকায়াত পড়ার নিয়ম শুরু করেন। তার কারণ এ ছিল না যে, তাদের তাহকীক ও তথ্যানুসন্ধান খোলাফায়ে রাশেদীনের তাহকীকের বিপরীত ছিল। বরঞ্চ তাদের লক্ষ ছিলো যাতে করে ছওয়াবের দিক দিয়ে মক্কার বাইরের লোক মক্কাবাসীদের সমান হতে পারে। মক্কাবাসীদের নিয়ম ছিলো এই যে, তারা তারাবীর প্রত্যেক চার রাকাআত পর কাবা ঘরের তাওয়াফ করতেন। এ দুই বুযুর্গ প্রত্যেক তাওয়াফের বদলে চার রাকায়াত পড়া শুরু করেন। এ নিয়ম যেহেতু মদীনাবাসীদের মধ্যে প্রচলিত ছিল এবং যেহেতু ইমাম মালেক মদীনাবাসীদের আমলকে সনদ মনে করতেন। সে জন্য তিনি পরবর্তীকালে বিশ রাকায়াতের স্থলে ছত্রিশ রাকায়াতের ফতোয়া দেন।
চার রাকায়াত পরপর বিশ্রামের সময় কি আমল করা যায়
তারাবীহ বা বিশ্রামের সময় ইচ্ছা করলে কেউ চুপচাপ বসেও থাকতে পারে অথবা মসবীহ পড়তে পারে এবং ইচ্ছা করলে নফল পড়তে পারে। মক্কা মুয়াযযমার লোক বসে থাকার পরিবর্তে তা্ওয়াফ করতেন। মদীনাবাসী চার রাকায়াত নফল পড়ে নিতেন। কতিপয় ফকিহ বলেন যে, তারাবীর সময় নিম্নের দোয়া পড়বেঃ
*******আরবী*********
বাদশাহ শাসন কর্তৃত্বের অধিকারী আল্লাহ সকল ত্রুটি বিচ্যুতি অক্ষমতা থেকে পাক পবিত্র। পাক ও মহান সত্তা যিনি, সকল সম্মান, শ্রদ্ধা, মহত্ব, ভয়ভীতি, শক্তিমত্তা, বড়ত্ব,পরাক্রমশীলতার অধিকারী। পবিত্র সেই সত্তা, যিনি চির জীবিত, যার নিদ্রা ও মৃত্যু নেই। তিনি পাক পবিত্র ও ত্রুটি বিচ্যুতির ঊর্ধ্বে । তিনি আমাদের রব এবং ফেরেশতাকুল এবং জিবরাঈলের রব প্রভু পরওয়ারদেগার। হে রব! আমাদেরকে জাহান্নামের আগুন থেকে নাজাত দাও।
বেতের নামাজের জামাত
শুধু রমজান মাসে বেতের নামাজ জামায়াতে পড়া প্রমাণিত আছে। রমজান ছাড়া অন্য মাসে বেতের জামায়াতে পড়া যায়েজ নেই।
*******আরবী*********
রমজান ছাড়া অন্য মাসে বেতেরের জামায়াত যায়েজ নেই। এতে মুসলিম উম্মতের ইজমা রয়েছে। (হেদায়া)
যারা একাকী নামাজ পড়লো তারাও জামায়াতে বেতেরের নামাজ পড়তে পারে। কিন্তু যারা তারাবীহ জামায়াতে পড়লো তাদের জন্য বেতের জামায়াতে পড় জরুরী। কারণ তারাবীর সুন্নাত নামাজ জামাতে পড়ার পর বেতেরের ওয়াজিব নামাজ একা পড়া দুরস্ত নয়। এটাও ঠিক নয় যে, তারাবীহ জামাতের সাথে পড়ে শুয়ে পড়বে এবং পরে তাহাজ্জুদের সাথে বেতের পড়বে।
তারাবীতে কুরআন খতম
রমজান মুবারকের পুরো মাসে একবার কুরআন পাক ক্রমানুসারে খতম করা সুন্নাতে মুয়াক্কাদাহ। (ইলমুল ফেকাহ)
নবী করীম (স) প্রতি মাসে হযরত জিবরাঈল আমীন (আ ) কে পুরো কুরআন শুনিয়ে দিতেন। যে বছর তিনি দুনিয়া থেকে বিদায় নেন, সে বছর জিবরাঈলকে তিনি দুবার কুরআন শুনিয়ে দেন। উম্মতকে তিনি এভাবে উব্ধুদ্ধ করেনঃ
রোজা ও কুরআন মুমিনের জন্য সুপারিশ করবে। রোজা বলবে হে আমার রব! আমি এ ব্যক্তিকে দিনের বেলায় খানা পিনা ও অন্যান্য সম্ভোগ থেকে বিরত রাখলাম এবং সে বিরত থাকলো। অতএব হে আমার রব! এ লোকের পক্ষে আমার সুপারিশ কবুল করো। কুরআন বলবে আমি তাকে রাতের বেলায় ঘুম ও বিশ্রাম থেকে বিরত রেখেছি। এবং সে তার মিষ্টি ঘুম ছেড়ে দিয়ে তোমার দরবারে দড়িয়ে দাড়িয়ে কুরআন পড়তে থাকে। অতএব হে আমার রব! এ ব্যক্তির পক্ষে আমার সুপারিশ কবুল কর। আল্লাহ উভয়ের সুপারিশ কবুল করবেন।(মিশকাত)
সাহাবায়ে কেরাম (রা) এ সুন্নাত যত্ন সহকারে পালন করেন। হযরত ওমর (রা) তারাবীহ নামায জামায়াত সহ পড়ার এবং এতে পুরো কুরআন শুনাবার বিশেষ ব্যবস্থা করতেন। দীন থেকে সাধারণ সম্পর্কহীনতা, লোকের অলসতা ও অমনোযোগিতার কারণে এ সুন্নাত ছেড়ে দেয়া কিছুতেই ঠিক নয়। অন্তত একবার তো তারাবীর মধ্যে পুরো কুরআন শুনার এবং শুনাবার ব্যবস্থাপনা অবশ্যই করা উচিত। আর যেখানে মানুষের মধ্যে উৎসাহ উদ্দীপনা দেখা যাবে, ইবাদাত ও কুরআন তেলাওয়াত অনুরাগ দেখা যাবে এবং নিশ্চিত হওয়া যাবে যে, কুরআন পাক পূর্ণ মনোযোগ ও আদবের সাথে থেমে থেমে এমনভাবে পড়া যাবে যে, তেলাওয়াতের হক আদায় হবে, সেখানে একাধিকবার খতম করাও পছন্দনীয় কাজ বলা হয়েছে। অবশ্যই তিন দিনের কম সময়ে কুরআন খতম করা ঠিক নয়। কারণ এ অবস্থায় কুরআন তেলাওয়াতের হক আদায় করা যাবে না।
নবী (সা) এর তেলাওয়াতের ধরণ হাদীসে এরূপ বর্ণনা করা হয়েছে যে তিনি এক একটি অক্ষর সুস্পষ্ট করে এবং এক একটি আয়াত আলাদা আলাদা করে পড়তেন। তিনি উম্মতকে তারতীলের সাথে এবং থেমে থেমে তেলাওয়াত করার ফযিলত বয়ান করতে গিয়ে বলেন-কুরআন পাঠকারীদের কেয়ামতের দিন বলা হবে- তোমরা দুনিয়ায় যেভাবে থেমে থেমে খোশ এলাহানের সাথে সেজেগুজে কুরআন পড়তে ঠিক তেমনিভাবে পড় এবং প্রত্যেক আয়াতের বিনিময় এক স্তর ওপরে ওঠাতে থাক। তোমরা তেলাওয়াতের সর্বশেষ আয়াতের নিকটেই তোমার বাসস্থান পাবে। (তিরমিযি)
জরুরী হেদায়াত
যদি কোথাও নামায ও কুরআনের প্রতি অনুরাগ অসাধারণ কম হয় এবং মুক্তাদীদের অলসতা ও অবহেলার কারণে এ আশংকা হয় যে, যদি তারাবীতে পুরো কুরআন খতম করার ব্যবস্থা করা হয়, তাহলে তা শুধু লোকের ওপর বোঝাই হবে না, বরঞ্চ মসজিদে আসা এবং জামায়াতে নামায পড়া তারা এড়িয়ে চলতে থাকবে, এমন অবস্থায় খতমে কুরআনের ব্যবস্থা না করাই ভালো। তখন সংক্ষিপ্ত সূরা দিয়ে তারাবীহ পড়তে হবে যাতে করে তারাবীর সুন্নাত থেকে মানুষ বঞ্চিত না হয়। কিছু লোক জ্ঞানের স্বল্পতার কারণে তারাবীতে কুরআন শুনা এবং শুনানোকে আসল উদ্দেশ্যে মনে করে। তারা তারাবীর নামাযে শান্ত পরিবেশ, ভারসাম্য এবং একাগ্রতার দিকে মোটেই লক্ষ্য রাখে না। এসব লোক যখন তারাবীতে গোটা কুরআন অত্যন্ত দ্রুতবেগে শুনে, তখন তারা পুনরায় না তারাবীহ পড়ার প্রতি যত্ন নেয় আর না জামায়াতে তারাবীহ পড়ার জন্যে মসজিদে আসা প্রয়োজন মনে করে। এ ধরনের চিন্তা অত্যন্ত মারাত্মক। যদি পুরো কুরআন শুনার সুযোগ না হয়, অথবা কুরআন খতম হয়ে যায়, তারপরও তারাবীর নামায এক স্থায়ী সুন্নাতে মুয়াক্কাদাহ। এর ব্যবস্থাপনায় কখনো অবহেলা প্রদর্শন করা উচিত নয়।
তারাবীহ নামাযের বিভিন্ন মাসায়েল
১. তারাবীর নিয়ত এভাবে করবে- দু রাকায়াত সুন্নাত তারাবীর নিয়ত করছি। তারপর দু রাকায়াতের নিয়ত। এমনিভাবে দশ সালাম সহ বিশ রাকায়াত পুরো করতে হবে।
২. তারাবীর পর বেতের পড়া উৎকৃষ্ট। কিন্তু কোনো কারণে যদি তারাবীহ পড়ার পূর্বে অথবা সমস্ত তারাবীহ পড়ার পূর্বে বেতের নামায পড়া হয়, তো জায়েয হবে।
৩. যদি কোনো মুক্তাদী বিলম্বে এলো এবং তার কিছু তারাবীহ বাকী থাকতে ইমাম বেতেরের জন্য দাঁড়ালো, তাহলে তার উচিত ইমামের সাথে বেতের পড়া। তারপর বাকী তারাবীহ পরে পুরো করবে।
৪. চার রাকাআত পড়ার পর এতো সময় পর্যন্ত আরাম নেয়া মুস্তাহাব যতো সময়ে চার রাকায়াত পড়া হয়েছে। কিন্তু বেশীক্ষণ বসা যদি মুক্তাদীদের জন্যে কষ্টকর হয় তাহলে অল্প সময় বসা ভালো।
৫. যদি কেউ এশার ফরয না পড়ে তারাবীহ শরীক হয় তাহলে তার তারাবীহ দুরস্ত হবে না।
৬. কেউ যদি এশার ফরয জামায়াতে পড়লো এবং তারাবীহ জামায়াতে পড়লো না, তার জন্যেও বেতের নামায জামায়াতে পড়া দুরস্ত হবে।
৭. যদি কেউ এশার ফরয জামায়াতে পড়লো না, সেও বেতের নামায জামায়াতে পড়তে পারে।
৮. বিনা ওজরে বসে তারাবীহ পড়া মাকরূহ। অবশ্য ওজর থাকলে বসে পড়া দুরস্ত।
৯. কেউ এশার ফরয জামায়াতে পড়তে পারলো না, তার জন্যে তারাবীর নামায জামায়াতে পড়া জায়েয।
১০. ফরয ও বেতের এক ইমাম এবং তারাবীহ দ্বিতীয় কোনো ইমাম পড়াতে পারে। হযরত ওমর (রা) ফরয এবং বেতের স্বয়ং পড়াতেন এবং তারাবীহ পড়াতেন হযরত ওবাই বিন কায়াব (রা)।
১১. যদি তারাবীর কয়েক রাকায়াত কোনো কারণে নষ্ট হয়ে যায় তাহলে তা পুনরায় পড়া জরুরী। তখন কুরআন পাকের ঐ অংশও পুনরায় পড়া উচিত যা নষ্ট হওয়া রাকায়াতগুলোতে পড়া হয়েছে যাতে কুরআন খতম সহীহ নামাযে হয়।
১২. তারাবীতে দ্বিতীয় রাকায়াতে বসার পরিবর্তে ইমাম দাড়িয়ে গেল, যদি তৃতীয় রাকায়াতের সেজদার পূর্বে তার মনে পড়ে যায় অথবা কোনো মুক্তাদী মনে করিয়ে দেয় তাহলে ইমামের উচিত বসে যাওয়া এবং তাশাহুদ পড়ে এক সালাম ফিরিয়ে সেজদা সাহু দেবে, তারপর নামায পুরো করে সালাম ফিরাবে। তাতে করে এ দুরাকায়াত সহীহ হবে। আর যদি তৃতীয় রাকায়াতে সেজদা করার পর মনে পড়ে তাহলে এক রাকায়াত তার সাথে মিলিয়ে চার রাকায়াত পুরো করবে। এ চার রাকায়াত দু রাকায়াতের স্থলাভিষিক্ত হবে।
১৩. যদি ইমাম দ্বিতীয় রাকায়াতে কাদার জন্যে বসে পড়ে এবং তারপর তৃতীয় রাকায়াতের জন্যে দাঁড়িয়ে যায় এবং এ অবস্থায় চার রাকায়াত পুরো করে তাহলে চার রাকায়াতই সহীহ হবে।
১৪. যারা এশার নামায জামায়াতে পড়েনি তাদের জন্যে তারাবীহ জামায়াতে পড়া দুরস্ত নয়। এজন্যে যে ফরয নামায একা পড়ে নফল নামায জামায়াতে পড়লে নফলকে ফরযের ওপর প্রাধান্য দেয়া হয়। তার দুরস্ত নয়।
১৫. কেউ যদি মসজিদে এমন সময় পৌঁছে যখন এশার ফরয হয়ে গেছে তাহরে সে প্রথমে ফরয পড়বে তারপর তারাবীতে শরীক হবে। তারাবীর যেসব রাকায়াত বাদ যাবে সেগুলো হয় বিরতির সময় পড়ে নেবে অথবা জামায়াতে বেতের পড়ার পর পড়বে।
১৬. কিছু লোক এশার ফরয নামায জামায়াতে পড়ার পর তারাবীহ জামায়াত করে পড়েছে। তাদের সাথে ঐসব লোকও শরীক হতে পারে যারা ফরয জামায়াতে পড়েনি। এজন্যে যে, এরা ঐসব লোকের অনুসরণ করেছে যারা ফরয নামায জামায়াতে পড়ে তারাবীহ জামায়াতের সাথে পড়ছে।
১৭. যারা এশার নামায জামায়াতে পড়েনি একা পড়েছে তারাও ঐসব লোকের সাথে বেতেরের জামায়াতে শরীক হতে পারে যারা ফরয নামায জামায়াতে পড়ে বেতের জামায়াতে পড়ছে।
১৮. আজকাল শবীনার যেরূপ রেওয়াজ হয়ে পড়েছে তা কিছুতেই জায়েয নয়। শবীনা পাঠকারী একান্ত বেপরোয়া হয়ে দ্রুতবেগে পড়ে যায়। তার না শুদ্ধ অশুদ্ধ পড়ার কোনো চিন্তা থাকে আর না তেলাওয়াতের আদবের দিকে সে খেয়াল করে। এ ধরনের কেরায়াত থেকে প্রভাব ও হেদায়াত গ্রহণ করার কোনো অনুভূতিই হয় না। কোনো প্রকারে খতম করাই হয় পাঠকারীর উদ্দেশ্যে। তারপর মুক্তদীদের অবস্থা এই হয় যে, কয়েকজন ইমামের পেছনে দাড়িয়ে থাকে বটে, কিন্তু অধিকাংশই কয়েক রাকায়াত মাত্র ইমামের সাথে পড়ে। অনেকে পেছনে বসে বসে গল্প করে। ইমামের দ্রুত পড়ার প্রশংসা করে এবং নানান ধরনের গল্প গুজব করে। এটা সে রাতের নামায ও তেলাওয়াত নয় যা নবী (স) শিক্ষা দিয়েছেন এবং যা সুন্নাত মনে করে সাহাবায়ে কেরাম রীতিমতো পালন করতেন। এ প্রকৃতপক্ষে কুরআনের সাথে যুলুম ও বাড়াবাড়ি করা এবং তারাবীর বিদ্রূপ করা।
কুরআন বলেঃ
*******আরবী*********
এ কিতাব কল্যাণ ও বরকতের উৎস যা আমরা তোমার ওপর নাযিল করেছি যাতে লোক তার আয়াতগুলোর ওপর চিন্তা-গবেষণা করতে পারে এবং জ্ঞানীগণ তার থেকে শিক্ষাগ্রহণ করতে পারে। (সূরা সাদঃ২৯)
নবী (স) বলেন, যে ব্যক্তি তিন দিনের কম সময়ে কুরআন খতম করলো। সে কিছুতেই কুরআন বুঝলো না। (তিরমিযি)
কুরআন বলে- যখন কুরআন পড়া হয় তখন পরিপূর্ণ মনোযোগ দিয়ে তা শুনো।
১৯. তারাবীতে কুরআন পড়ার নিয়ম এই যে, কোনো এক সূরায় বিসমিল্লাহ উচ্চস্বরে পড়তে হবে। কারণ এ কুরআনের একটি আয়াত। পুরে কুরআন পাঠকারীকে বিসমিল্লাহ পড়তে হবে এবং শ্রবণকারীকে শুনতে হবে। এজন্যে হাফেযকে উচ্চস্বরে পড়তে হবে। সাধারণত কুল হু আল্লাহ এর প্রথমে বিসমিল্লাহ পড়া হয়। এটা জরুরী নয়। যে কোনো সুরার শুরুতে পড়া যায়। যে কোনো সুরার সূতে পড়া উচিত যাতে করে লোকের এ ভুল ধারণা দূর হয় যে, কুল হু আল্লাহ এ শুরুতে পড়তে হয়। যাদের মতে এ প্রত্যেক সূরায় একটি আয়াত তাদের উচিত তারাবীর নামাযে প্রত্যেক সুরার শুরুতে তা পড়বে। হানাফী মতে বিসমিল্লাহ কুরআন মজীদের একটি আয়াত। কিন্তু ইমাম শাফেয়ী এবং মক্কা ও কুফার ক্বারীগণের মতে এ প্রত্যেক সূরার একটি আয়াত।
২০. কেউ কেউ তারাবীতে তিনবার কুল হু আল্লাহু পড়ে (কেউ বলেন- কুল হু আল্লাহ তিনবার পড়া মুস্তাহাব। কিন্তু নামাযে নয়, নামাযের বাইরে) তা পড়া মাকরূহ।
২১. কুরআন খতম করার পর সঙ্গে সঙ্গে দ্বিতীয়বার কুরআন শুরু করা সুন্নাত। নবী (সা) বলেন, আল্লাহ তায়ালা এ কাজ পছন্দ করেন যে, কেউ কুরআন খতম করলে সঙ্গে সঙ্গে দ্বিতীয়বার শুরু করে ………………… পর্যন্ত পড়বে।
কুরআন তেলাওয়াতের নিয়মনীতি
১। তাহারাত পাক পবিত্রতা
কুরআন পাক আল্লাহ পাকের পবিত্র ও মহান কালাম। তাতে হাত লাগাতে এবং তেলাওয়াত করার জন্যে পবিত্রতা ও পরিচ্ছন্নতা পুরোপুরি ব্যবস্থা দরকার। অযু না থাকলে অযু করা এবং গোসলের প্রয়োজন হলে গোসল করা অপরিহার্য।
*******আরবী*********
তাতে সে ব্যক্তিই হাত লাগাতে পারে যে একান্ত পাক পবিত্র। (সূরা ওয়াকিয়াঃ ৭৯)
হায়েয নেফাস ও জানাবাতের (গোসল ফরয হওয়া) অবস্থায় কুরআন শুনা তো জায়েয, কিন্তু পড়া এবং স্পর্শ করা হারাম। বিনা অযুতে পড়া জায়েয কিন্তু স্পর্শ করা ঠিক নয়। হযরত আয়েশা (রা) বলেন, নবী (স) সকল অবস্থায় তেলাওয়াত করতেন এবং বিনা অযুতেও। কিন্তু জানাবাতের অবস্থায় কখনো তেলাওয়াত করতেন না। হযরত ওমর (রা) বলেন, হায়েয হয়েছে এমন নারী এবং গোসল ফরয হয়েছে এমন লোক কুরআন থেকে কিছুই পড়বে না। (অর্থাৎ এমন অবস্থায় কুরআন পড়া হারাম) (তিরমিযি)
২। কুরআন তেলাওয়াতের সময় নিয়ত খাটি হওয়া উচিত। তেলাওয়াতের উদ্দেশ্যে হতে হবে শুধু আল্লাহর সন্তুষ্টি এবং হেদায়াত চাওয়া। কুরআনের মাধ্যমে মানুষকে আকৃষ্ট করা। নিজের খোশ এলহানের ওপর গর্ব করা, নিজের দীনদারির ঢাকঢোল পেটানো, লোকে প্রশংসা করুক এমন বাসনা পোষণ করা নিকৃষ্ট ধরনের মানসিকতা। এমনিভাবে যারা মানুষ দেখানো কুরআন পড়ে অথবা দুনিয়ার স্বার্থ হাসিলের জন্যে কুরআন পড়ে তারা কখনো কুরআন থেকে হেদায়াত লাভ করবে না। এস লোক কুরআন পড়া সত্ত্বেও কুরআন থেকে বহু দূরে অবস্থান করে। প্রকৃতপক্ষে যে নিকৃষ্ট ধরনের মানসিকতা, অসৎ প্রবণতা এবং অসাধু উদ্দেশ্যে পোষণ করে,তার মধ্যে কুরআনের মহত্ব ও মর্যাদা সম্পর্কে না কোনো অনুভূতির সঞ্চার হতে পারে, আর না কুরআনের পরিচয় ও নিগূঢ় তত্ত্ব লাভ করতে পারে।
৩। নিয়মিত পাঠ এবং একে অপরিহার্য মনে করা
কুরআন পাঠ দৈনিক নিয়মিতভাবে হওয়া উচিত। কোনো দিন বাদ না দিয়ে দৈনিক পড়া মুস্তাহাব। তেলাওয়াত যে কোনো সময়ে করা যায় কিন্তু উপযুক্ত সময় হচ্ছে সকাল বাদ ফজর। যাদেরকে আল্লাহ কুরআন হিফয করার সৌভাগ্য দিয়েছেন তাদের তো দৈনিক পড়া এজন্যে নেহায়েত জরুরী যে, না পড়লে মনে থাকবে না। আর কুরআন পাক মুখস্থ করার পর ভুলে যাওয়া কঠিন গোনাহের কাজ। নবী (স) বলেন, যে ব্যক্তি কুরআন পাক মুখস্থ করেছে, তারপর ভুলে গিয়েছে সে কেয়ামতের দিন কুষ্ঠ ব্যাধিগ্রস্ত হবে। (বুখারী)
নবী (সা) আরও বলেন-
কুরআন সম্পর্কে চিন্তা করো, নতুবা এ তোমাদের বক্ষ থেকে বেরিয়ে যাবে। আল্লাহর কসম, রশি ঢিল করলে যেমন উট পালিয়ে যায়, ঠিক তেমনি সামান্য অবহেলা ও বেপরোয়া মনোভাবের জন্যে কুরআন বক্ষ থেকে বের হয়ে পালিয়ে যায়। (মুসলিম)
নিয়মিত তেলাওয়াতের প্রেরণা দিতে গিয়ে তিনি বলেন, যে ব্যক্তি কুরআন পড়লো এবং দৈনিক নিয়মিত তেলাওয়াত করতে থাকলো, তার দৃষ্টান্ত মিশকে পরিপূর্ণ থলিয়ার মতো যার সুগন্ধি চারদিকে ছড়িয়ে পড়ে। আর যে ব্যক্তি কুরআন পড়া শিখেছে কিন্তু তা তেলাওয়াত করে না তার দৃষ্টান্ত মিশকে পরিপূর্ণ বোতলের মতো যা কর্ক বা ছিপি দিয়ে বন্ধ করা আছে। (তিরমিযি)
খোশ এলহানের সাথে তেলাওয়াত করার বিরাট সওয়াব বর্ণনা করতে গিয়ে নবী (স) বলেন, কেয়ামতের দিনে কুরআন পাঠকারীদের বলা হবে, তোমরা যেমন থেমে ও খোশ এলহানে দুনিয়ায় কুরআন পড়তে তেমনি পড় এবং প্রত্যেক আয়াতের বিনিময়ে এক একটি স্তর ওপরে উঠতে থাক। তোমার ঠিকানা হবে তোমার শেষ আয়াতের নিকটে। (তিরমিযি)
রাগ-রাগিনীসহ কুরআন পাঠ মাকরূহ তাহরীমি। এর থেকে বিরত থাকতে হবে।
৪। কুরআন শুনার ব্যবস্থাপনা
উৎসাহ উদ্দীপনাসহ কুরআন শুনার ব্যবস্থাপনাও হওয়া উচিত। হযরত খালেদ বিন মাদান বলেন, কুরআন শুনার সওয়াব কুরআন পড়ার দ্বিগুণ। (দারেমী)
নবী (সা) অন্যের কুরআন পড়ার শুনতে বড়ো ভালবাসতেন। একবার তিনি হযরত আবদুল্লাহ বিন মাসউদ (রা) কে বললেন, আমাকে কুরআন পড়ে শুনাও। হযরত আবদুল্লাহ বিন মাসউদ (রা) বললেন, হুজুর আপনাকে কুরআন শুনাবো? কুরআন তো আপনার ওপরে নাযিল হয়েছে। নবী (সা)বললেন, হ্যাঁ শুনাও। কেউ পড়লে তা শুনতে আমার বড়ো ভালো লাগে। তখন হযরত আবদুল্লাহ বিন মাসউদ (রা) সূরা নিসা পড়া শুরু করলেন। যখন তিনি পড়লেন-
*******আরবী*********
চিন্তা করে দেখ, তখন কি অবস্থা হবে যখন আমরা প্রত্যেক উম্মত থেকে একজন সাক্ষ্যদাতা নিয়ে আসব এবং তাদের ওপর তোমাকে সাক্ষ্যদাতা হিসেবে দাঁড় করাব। (সূরা আন নিসাঃ৪১)
তখন নবী (সা) বললেন, থাম, থাম।
হযরত ইবনে মাসউদ (রা) বলেন, আমি দেখলাম নবী (স)এর দু চোখ দিয়ে পানি ঝরছে। (বুখারী)
হযরত আবু মূসা (রা) খুব সুন্দর কুরআন পড়তেন। যখনই তার সাথে হযরত ওমর (রা) এর দেখা হতো, তিনি বলতেন, আবু মূসা, আমাকে আমার প্রভুর স্মরণ করিয়ে দাও। তখন আবু মূসা কুরআন তেলাওয়াত শুরু করতেন। (সুনানে দারেমী)
৫। চিন্তা গবেষণা
কুরআন বুঝে শুনে পড়া, তার আয়াতগুলোর ওপরে চিন্তা গবেষণা করা এবং  তার দাওয়াত ও হেকমত আয়ত্ত করার অভ্যাস করা উচিত। এ সংকল্প নিয়ে তেলাওয়াত করা উচিত যে, তার আদেশগুলো মানতে হবে এবং নিষেধগুলো থেকে দূরে থাকতে হবে। আল্লাহর কেতাব তো এজন্যেই নাযিল হয়েছে যে, তা বুঝে শুনে পড়তে এবং তার হুকুমগুলোর ওপর আমল করতে হবে।
আল্লাহ বলেনঃ
*******আরবী*********
যে কেতাব তোমার ওপরে নাযিল করেছিলাম তা বরকতপূর্ণ যাতে করে তারা এর আয়াতগুলো ওপর চিন্তা গবেষণা করতে পারে এবং জ্ঞানীগণ শিক্ষা গ্রহণ করতে পারে। (সূরা সাদঃ ২৯)
ফর ফর করে দ্রুত কয়েক সূরা পড়ার চেয়ে অল্প কিছু চিন্তা ভাবনা করে ও বুঝে পড়া অনেক ভালো। হযরত আবদুল্লাহ বিন আব্বাস (রা) বলেনঃ ক্বাদর এবং আল কারি’আ এর মতো ছোট ছোট সূরা বুঝে পড়া অনেক ভালো ফর ফর করে আল  ইমরান এবং বাকারা পড়ার চেয়ে।
নফল নামাযে এটাও জায়েয যে, কেউ একই সূরা অথবা একই আয়াত বার বার পড়বে। তার মর্মকথা অন্তর্নিহিত তাৎপর্য সম্পর্কে চিন্তা ভাবনা করবে এবং মহব্বতের সাথে বার বার পড়বে। একবার নবী (সা) একই আয়াত বারবার সারারাত পড়তে থাকনে এবং এভাবে ভোর হয়ে যায়। আয়াতটি হলো-
*******আরবী*********
হে রব! তুমি যদি তাদেরকে আযাব দাও তাহলে এরা তো তোমার বান্দাহ। আর যদি ক্ষমা করে দাও তাহলে তুমি মহাপরাক্রমশালী ও বিজ্ঞ। (সূরা আল মায়েদাঃ ১১৮)
অবশ্য কুরআনের অর্থ ও মর্ম না জেনে তেলাওয়াত করারও বিরাট সওয়াব রয়েছে কিন্তু যে তেলাওয়াতের দ্বারা অন্তরের পরিশুদ্ধি ও তাযকিয়া হয় এবং আমলে প্রেরণা সঞ্চার হয় তাহলো বুঝে শুনে পড়া।
নবী (সা) বলেনঃ লোহা যেমন পানিতে জং ধরে, তেমনি অন্তরে জং ধরে। সাহাবীগণ জিজ্ঞেস করেন, ইয়া রাসূলাল্লাহ! তাহলে এ জং দূর করার উপায় কি? নবী (স) বললেন, বেশী বেশী মৃত্যুতে স্মরণ করা এবং কুরআন তেলাওয়াত করা।
তাওরাতে আছে, আল্লাহ বলেন, বান্দাহ! তোমার লজ্জা করেন যে, যখন সফরে তোমার কাছে তোমার ভাইয়ের চিঠি আসে তখন তুমি থেমে যাও অথবা রাস্তা থেকে সরে গিয়ে বসে পড় এবং তার এক একটি অক্ষর পড়তে থাক ও তার ওপর চিন্তা গবেষণা কর। আর এক কেতাব (তাওরাত) হচ্ছে আমার ফরমান যা তোমার জন্যে পাঠিয়েছি যাতে করে তুমি সবসময় চিন্তা-গবেষণা করতে পার এবং তার হুকুমগুলো মেনে চলতে পার। কিন্তু তুমি এটা মানতে অস্বীকার করছো এবং তার হুকুম মেনে চলতে গড়িমসি করছ আর যদি তা পড় তো তা নিয়ে চিন্তা গবেষণা কর না। (কিমিয়ায়ে সায়াদাত)
হযরত হাসান বসরী (রা) বলেন, ইসলামের প্রথম যুগের লোকেরা পুরোপুরি বিশ্বাস করতেন যে, কুরআন হচ্ছে আল্লাহর ফরমান এবং তার পক্ষ থেকে  এ নাযিল হয়েছে। বস্তুত তারা রাতের বেলায় গভীর মনোনিবেশ সহকারে কুরআন তেলাওয়াত করতেন এবং দিনের বেলায় তার হুকুমগুলো মেনে চলতেন। কিন্তু তোমাদের অবস্থা হচ্ছে এই যে, তোমরা শুধুমাত্র তার শব্দগুলো পড় এবং অক্ষরগুলোর যের যবরও দুরস্ত কর। কিন্তু আমলের দিক দিয়ে বলতে গেলে বলতে হয় যে, তোমরা এ ব্যাপারে একেবারে পেছনে রয়েছ। (কিমিয়ায়ে সায়াদাত)
৬। একনিষ্ঠা ও বিনয়
পূর্ণ একাগ্রতা, আগ্রহ ও বিনয় নিষ্ঠার সাথে কেবলা মুখী হয়ে তেলাওয়াত করা উচিত। তেলাওয়াতের সময় অবহেলা করে ও বেপরোয়া হয়ে, এদিক সেদিক তাকানো, কারো সাথে কথাবার্তা বলা, এমন কোনো কাজ করা যাতে একাগ্রতা নষ্ট হয় এসব কিছুই মাকরূহ বা অবাঞ্ছিত কাজ।
৭। তাউয-তাসমিয়া
তেলাওয়াত শুরু করার সময় *******আরবী****** পড়া উচিত।মাঝে অন্য কোনো কাজের দিক মন দিলে কিংবা কারো সাথে কথাবার্তা বললে পুনরায় *****আরবী********* পড়া উচিত। নামাযের বাইরে প্রত্যেক সূরার শুরুতে পড়া *******আরবী*********মুস্তাহাব। শুধু সূরা তাওবার শুরুতে *******আরবী********* না পড়া উচিত।
৮। তেলাওয়াতের সময় কুরআন পাকের বিষয়বস্তু থেকে প্রভাব গ্রহণ এবং তা প্রকাশ করা মুস্তাহাব। (কিন্তু এ ব্যাপারে অত্যন্ত হুশিয়ার ও সজাগ থাকতে হবে। কারণ রিয়া মানুষের সকল নেক আমল  বরবাদ করে দেয়।) যখন পুরস্কার এবং জান্নাতের অফুরন্ত নিয়ামতের উল্লেখ করা হয় এবং মুমিনদেরকে রহমত ও মাগফিরাতের কল্যাণ ও নাজাতের, আল্লাহর সন্তুষ্টি ও দীদারের সুসংবাদ দেয়া হয় তখন আনন্দিত হওয়া উচিত। আর যখন আল্লাহর রাগ ও গজব, জাহান্নামের ভয়ানক শাস্তি, জাহান্নামবাসীর আর্তনাদ প্রভৃতির উল্লেখ সম্বলিত আয়াতগুলো পড়া হবে, তখন তার ভয়ে কাদা উচিত। যদি কান্না না আসে তো কান্নার চেষ্টা করতে হবে। নবী (স) তেলাওয়াতের সময় আযাবের আয়াত পড়ে দোয়া করতেন এবং ক্ষমা করে দেয়ার আয়াত পড়লে তাসবিহ পড়তেন।
৯। আওয়াজে ভারসাম্য
তেলাওয়াত অতি উচ্চস্বরে ও অতি নিম্নস্বরে নয় বরঞ্চ উভয়ের মাঝামাঝি স্বরে পড়তে হবে যেন নিজের মনও সেদিকে আকৃষ্ট হয় এবং শ্রোতাদের শোনার আগ্রহ সৃষ্টি হয়। তাহলে চিন্তা-ভাবনার দিকে মন আকৃষ্ট হবে।
কুরআন বলেঃ
*******আরবী*********
এবং নামায বেশী উচ্চস্বরে পড়ো না, আর না একেবারে নিম্নস্বরে। বরঞ্চ উভয়ের মাঝামাঝি স্বর অবলম্বন করবে। (সূরা বনী ইসরাঈলঃ ১১০)
১০। তাহাজ্জুদে তেলাওয়াতের বিশেষ যত্ন
তেলাওয়াত যখনই করা হোক না কেন তা প্রতিদান ও সওয়াবের বিষয় এবং হেদায়াতের কারণ হয়, কিন্তু বিশেষ করে তাহাজ্জুদ নামাযে কুরআন তেলাওয়াতের ফযিলত সবচেয়ে বেশী। আর একজন মুমিনের এটাই আকাঙ্ক্ষা হওয়া উচিত যে, সে উচ্চ থেকে উচ্চতর মর্যাদা লাভ করে। তাহাজ্জুদের মনোরম সময় রিয়া, প্রদর্শনী ও কৃত্রিমতা থেকে মুক্ত; লিল্লাহিয়াত ও আল্লাহর দিকে একমুখী হওয়ার উৎকৃষ্টতম এক পরিবেশ, বিশেষ করে মানুষ যখন আল্লাহর সামনে দাড়িয়ে একনিষ্ঠা ও আন্তরিক আগ্রহ সহকারে আল্লাহর কালাম তেলাওয়াত করতে থাকে। নবী (স) তাহাজ্জুদে লম্বা তেলাওয়াত করতেন।
১১। কুরআন শরীফ দেখে তেলাওয়াতের বিশেষ যত্ন
নামায ছাড়া অন্য সময় কুরআন শরীফ দেখে তেলাওয়াত করলে অধিক সওয়াব ও উত্তম প্রতিদান পাওয়া যায়। একেতো তেলাওয়াত করার সওয়াব দ্বিতীয়তঃ কালামুল্লাহকে হাতে স্পর্শ করার এবং স্বচক্ষে প্রত্যক্ষ করার সওয়াব ও বদলা। (এতকাল)
১২। ক্রমিক পদ্ধতির লক্ষ্য
কুরআনে যে ক্রমিক পদ্ধতি রয়েছে সূরাগুলো সে ক্রমানুসারে পড়া উচিত। অবশ্যই শিশুদের পাট সহজ করার জন্যে এ ক্রমিক ধারা অবলম্বন না করা পড়া জায়েয। যেমন আমপারা সূরা নাস থেকে উল্টো দিকে সূরা নাবা পর্যন্ত পড়ানো হয়। তবে কুরআন পাকের ক্রমিক পদ্ধতির খেলাপ তেলাওয়াত করা সর্বসম্মতিক্রমে নিষিদ্ধ।
১৩। মনের গভীর একাগ্রতা
অনেকে অযীফা ও যিকির আযকার গভীর একাগ্রতার সাথে করে থাকেন এবং ঘন্টার পর ঘন্টা কাটিয়ে দেন। কিন্তু কুরআন তেলাওয়াত ততোটা একাগ্রতার সাথে করেন না। অথচ কুরআন তেলাওয়াতের চেয়ে উৎকৃষ্ট আর কোনো যিকির অযীফা হতে পারে না। এর চেয়ে ভালো তাযকিয়ার নফসের (আধ্যাত্মিক পরিশুদ্ধির) উপায় আর কিছু হতে পারে না, কুরআনের ওপরে অন্য কোনো অযীফাকে প্রাধান্য দেয়া দীনকে ভালোভাবে উপলব্ধি না করারই ফল এবং তা গোনাহও বটে। নবী (স) বলেন, বান্দাহ তেলাওয়াতে কুরআনের মাধ্যমেই আল্লাহর বেশী নিকটবর্তী হতে পারে। (কিমিয়ায়ে সায়াদাত)
নবী (সা) বলেন, আমার উম্মতের জন্যে সবচেয়ে ভালো ইবাদাত হচ্ছে তেলাওয়াতে কুরআন।
১৪। তেলাওয়াতের পর দোয়া
তেলাওয়াতের পর নিম্নের দোয়া পড়া সুন্নাতঃ
*******আরবী*********
হে আল্লাহ!তুমি কুরআনের অসিলায় আমার ওপর রহম কর, তাকে আমার পথপ্রদর্শক, নূর, হেদায়াত ও রহমত বানিয়ে দাও। হে আল্লাহ! তার মধ্যে যা কিছু ভুলে যাই তা স্মরণ করিয়ে দাও, আর যা জানি না তা শিখিয়ে দাও এবং আমাকে তাওফিক দাও যেন রাতের কিছু অংশে এবং সকাল সন্ধ্যায় তা তেলাওয়াত করতে পারি। আর হে রাব্বুল আলামীন তুমি তাকে আমার সপক্ষে দলীল প্রমাণ বানিয়ে দাও।


Friday, April 28, 2017

আল-কুরআনেরর পরিসংখ্যান সংক্রান্ত মোজেজা

মিশরের বিখ্যাত পন্ডিত ডাঃ তারিক আল সুওয়াইদান কুরআনের শব্দগুলি নিয়ে গবেষণা (পরিচালনা) করেছেন।তার গবেষণা মতে যে সব বিষয়গুলো পস্পরের সাথে সম্পর্কযুক্ত সেগুলোর সংখ্যা কোরআন মাজীদে সমান।তাঁর গবেষণার পরিসংখ্যান-সংক্রান্ত কিছু ফলাফল নিম্নে দেওয়া হচ্ছেঃ


দুনিয়া-১১৫ বার                        আখেরাত-১১৫ বার

ফেরেশতা -৮৮ বার                    শয়তান -৮৮ বার

জীবন - ১৪৫ বার                          মরণ - ১৪৫ বার

নর -২৪ বার                                   নারী - ২৪ বার

জনগণ -৫০ বার                              আল্লাহর প্রেরিত দূত-৫০ বার

ইবলিস -১১                                      ইবলিস থেকে পান চাওয়া-১১ বার

বিপদ -৭৫ বার                                   ধন্যবাদ -৭৫ বার

সদকাহ -৭৩ বার                                 প্রশান্তি -৭৩ বার

বিপথে পরিচালিত মানুষ-১৭ বার            মৃত মানুষ -১৭ বার

মুসলমান -৪১ বার                                 জিহাদ -৪১ বার

যাদু -৬০ বার                                        ফিৎনাহ -৬০ বার

যাকাত -৩২ বার                                    বরকত -৩২ বার

লাভ -৫০ বার                                        ক্ষতি -৫০ বার

অন্তর -৪৯ বার                                       নূর(আলো) -৪৯ বার

জিহ্বা বা ভাষা-২৫ বার                             ধর্মীয় উপদেশ বা বক্তৃতা-২৫ বার

কষ্ট বা ক্লেশ -১১৪ বার                              ধৈর্য্য -১১৪ বার

মুহাম্মাদ(সাঃ) -৪ বার                              শরীয়াহ - ৪ বার



তিনি কোরআন মাজীদে আরো খুঁজে পান-
'মাস' শব্দটি আছে ১২ বার
'দিন' শব্দটি আছে ৩৬৫ বার

এবং জল(সগর) ৩২ বার
 এবং স্থল ১৩ বার

জল ও স্থল সংখ্যাগুলির যোগফল ৩২+১৩= ৪৫,সাধারণ হিসাব করে দেখুন,
জল হচ্ছে ৩২/৪৫ X ১০০=৭১.১১%
আর স্থল হচ্ছে ১৩/৪৫ x১০০= ২৮.৮৯%
এ ফল হচ্ছে জল ও স্থলের শতকরা হার ;যা আজ বিজ্ঞানীরা বাস্তবে পরিমাপ করেছেন।

কোরআন হল জীবন্ত মোজেজা।যতদিন মানুষ থাকবে ততদিন কোরআনের মোজেজা প্রকাশ পেতেই থাকবে কারণ এটাতো মহান সৃষ্টিকর্তা আল্লাহ রাব্বুল-আলামীনের গ্রন্থ। যে এ গ্রন্থ থেকে হেদায়েত পেতে চাইবে সে অবশ্যই হেদায়েত পাবে,আর যে তা থেকে মুখ ফিরিয়ে রাখবে সে তো চিরকাল গোমরাহীতেই থাকবে।

Monday, March 20, 2017

নাসিরুদ্দিন আলবানী রহঃ রচিত ‘সিলসিলাতুল আহাদীসিয যয়ীফা’ অনূদিত বাংলা সংস্করণ – একটি পর্যালোচনা.......

নাসিরুদ্দিন আলবানী রহঃ রচিত ‘সিলসিলাতুল আহাদীসিয যয়ীফা’ অনূদিত বাংলা সংস্করণ – একটি পর্যালোচনা.......
মাওলানা মুহাম্মাদ আব্দুল মালেক //.


নাসিরুদ্দিন আলবানী রহঃ গত শতাব্দীর একজন ব্যাপক আলোচিত ইসলামী ব্যক্তিত্ব। তাঁর সংকলিত বিশাল গ্রন্থ ‘সিলসিলাতুয যয়ীফা’ হাদিস বিশারদদের মধ্যে ব্যাপক বিতর্কের সৃষ্টি করেছে। স্বভাবতই এ নিয়ে সাধারণ মুসলমানদেরও আগ্রহ কম নয়। ফতওয়া বিভাগগুলোতে এ বিষয়ে মানুষের বহু প্রশ্ন এসে থাকে। এমনি একটি প্রশ্ন এবং বিষয়টির গুরুত্ব অনুধাবন করে কিছুটা বিস্তারিতভাবে এর জবাব পেশ করা হল।
এখানে উল্লেখ করা প্রয়োজন যে, আলোচ্য বিষয়টি মূলত গবেষণামূলক ইলমী আলোচনা হওয়ায় প্রয়োজনের খাতিরেই লেখাটিতে ব্যাপকভাবে পারিভাষিক শব্দ ব্যবহৃত হয়েছে। -সম্পাদক
......
প্রশ্ন:.........
বরাবর,
ফতওয়া বিভাগ মারকাযুদ্দাওয়া আলইসলামিয়া ঢাকা......
৭৯/১এ, উত্তর যাত্রাবাড়ী, ঢাকা-১২০৪....
বিষয়: ‘যয়ীফ ও জাল হাদিস সিরিজ’ কিতাব ও কিতাবের মূল লেখক সম্পর্কে ফতওয়া বিভাগের মন্তব্য লিখিতভাবে জানার প্রসঙ্গে।
জনাব,...
প্রথমে আমার সালাম গ্রহণ করবেন। ফতওয়া বিভাগের মাধ্যমে আপনার নিকট উক্ত বিষয় সম্পর্কে জানার আবেদন করছি।....
উল্লেখ্য, ATN বাংলা টিভির ইসলামী অনুষ্ঠানে মাওলানা দেলাওয়ার হোসাইন সাঈদী কিতাবটির মূল লেখক সম্পর্কে খুব ভাল মন্তব্য করেছেন। তিনি এও বলেছেন যে, উক্ত লেখক নাকি আহলে আরব তথা আরব ভূখণ্ডের শ্রেষ্ঠ মুহাদ্দিস ছিলেন এবং ৬০এর দশকে তিনি মদীনা বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রধান মুহাদ্দিস পদেও নাকি ছিলেন।
অতয়েব, মাওলানা সাঈদী সাহেবের তথ্যের ব্যাপারে সন্দেহ হওয়ার কারণে কিতাবের মূল লেখক সম্পর্কে সঠিক বিষয় জানানোর জন্য আবেদন করছি।
(সঙ্গে কিতাবটিও সংযুক্ত হল।)
আবেদনকারী: মুহাম্মাদ রাইহান ১২৪, চকবাজার, ঢাকা, ৩১/০৩/২০০৪ঈ.
উত্তর:......
শায়খ নাসিরুদ্দীন আলবানী রহ. (মৃত্যু ১৪২০হি.) একজন প্রসিদ্ধ ব্যক্তিত্ব। তিনি তাঁর জীবনের সবচেয়ে বড় অংশ ইলমে হাদীসের খেদমতে ব্যয় করেছেন। মানুষের মধ্যে সহীহ এবং যয়ীফ হাদিসের পার্থক্য নির্ণীত হোক, এ ব্যাপারে তিনি সদা সচেষ্ট ছিলেন। তাঁর এই উদ্যোগ নিঃসন্দেহে প্রশংসনীয় এবং আল্লাহ চাহে তো এজন্য তিনি আখেরাতে উত্তম বদলা পাবেন। ولا نزكي علي الله احدا তথাপি তাঁর সমসাময়িক মুহাক্কিক ন্যায়নিষ্ঠ আহলে ইলমের দৃষ্টিতে তাঁর রচনা ও গবেষণা কর্মের যেসব বিচ্যুতি ধরা পড়েছে তা থেকে চোখ বন্ধ রাখাও সমীচীন নয়। যথা-
(১). শায়খ আলবানী রহ. উলূমুল হাদীসের জ্ঞান এ বিষয়ের কোন বিজ্ঞ পণ্ডিতের নিকট থেকে গ্রহণ করেননি।
শায়খ আলবানী রহ.এর বিভিন্ন বৈশিষ্ট্য থাকা সত্ত্বেও তাঁর ব্যাপারে এ বিষয়টি সর্বজন স্বীকৃত যে, তিনি উলূমুল হাদীসের জ্ঞান এ বিষয়ের কোন বিজ্ঞ পণ্ডিতের নিকট থেকে গ্রহণ করেননি। এ ব্যাপারে নিজের অধ্যয়নই তাঁর মূল নির্ভর। অথচ শাস্ত্রীয় ব্যাপারে সর্বজন স্বীকৃত একটি মূলনীতি, অভিজ্ঞতাও যার সাক্ষ্য প্রদান করে তা এই যে, যেকোনো শাস্ত্রে পরিপক্বতা অর্জনের জন্য সে শাস্ত্রের পণ্ডিত ব্যক্তিদের সহচার্য লাভ করা জরুরী। ব্যক্তিগত অধ্যয়নে জ্ঞানভাণ্ডার সমৃদ্ধ হতে পারে কিন্তু শাস্ত্রীয় পরিপক্বতা কোন শাস্ত্রীয় পণ্ডিতের সহচার্য ছাড়া অর্জিত হওয়া বাস্তবতার নিরিখে অসম্ভব।

আমাদের জানা মতে হাদীস শাস্ত্রে আলবানী রহ.এর একজন মাত্র উস্তাদ আছেন। তাঁর কাছ থেকেও তিনি শুধু প্রথাগত ‘ইজাযত’ গ্রহণ করেছেন। তাঁর সহচার্য অবলম্বন করা, তাঁর নিকট থেকে শাস্ত্রীয় জ্ঞান লাভ করা, কোনটাই তাঁর পক্ষে সম্ভব হয়নি। (দেখুন: মুহাদ্দিস হাবীবুর রহমান আজমী (মৃত্যু ১৪১২হি.) ‘আলআলবানী শুযূযুহু ওয়াআখতাউহু’ ১/৯; শায়খ মুহাম্মাদ আওওয়ামা, আসারুল হাদীসিশ শরীফ ফিখতিলাফিল আইম্মাতিল ফুকাহা ৪৭)
এজন্য উলূমুল হাদীসের একজন সচেতন ছাত্রের কাছেও –যার কোন শাস্ত্রজ্ঞের সহচার্য লাভ হয়েছে- আলবানী সাহেবের এই দুর্বলতার প্রভাব তাঁর রচনাবলীতে অনেক স্থানেই প্রকটভাবে অনুভূত হয়। এ প্রসঙ্গে আমার নিজের অভিজ্ঞতার কথাই বলতে পারি। অনেক দীর্ঘ সময় শায়খ আলবানী রহ.এর রচনাবলি অধ্যয়ণের সুযোগ আমার হয়েছে। তাঁর রচনাবলীতে তথ্য ও উদ্ধৃতির প্রাচুর্য থাকলেও ইলমী গভীরতা কম বোধ হয়েছে। সূক্ষ্ম ও মতপার্থক্যপূর্ণ বিষয়াদিতে অধিকাংশ ক্ষেত্রেই তাঁর আলোচনা অগভীর সিদ্ধান্তে সমাপ্ত হয়। এ জাতীয় অনেক দৃষ্টান্ত মুহাক্কিকগণের লিখিত কিতাবসমূহে পাওয়া যাবে। এ সংক্ষিপ্ত পর্যালোচনা-নিবন্ধে সে সবের উদ্ধৃতি সম্ভব নয়; এজন্য আরবী ভাষা জানেন এমন পাঠক আমার রচনাধীন الشيخ الاالباني وكتابه سلسلة الضعيفة (আশ্‌শায়খ আল-আলবানী ওয়া-কিতাবুহু সিলসিলাতুয যয়ীফা) অধ্যয়ন করতে পারেন।
উদাহরণস্বরূপ এখানে কয়েকটি নমুনা পেশ করছি:
(ক) سكتوا عنه শব্দটি ‘জারহে মুবহাম’ হওয়ার ব্যাপারে কোন সন্দেহ নেই। উলূমুল হাদীস এবং ‘জারহে তাদীল’এর সাথে জানাশোনা আছে এমন একজন ছাত্রও এ বিষয়টি বোঝে। কিন্তু তিনি অত্যন্ত গর্বের সাথে শব্দটি ‘জারহে মুফাসসার’ হওয়ার ঘোষণা দেন এবং এ ব্যাপারে এমন দলীল পেশ করেন যে, এতে শাস্ত্রজ্ঞদের ‘ইবারত’ বোঝার ব্যাপারে তাঁর অদক্ষতা ও দুর্বলতার একটি নতুন দৃষ্টান্ত সৃষ্টি হয়েছে। (দেখুন সিলসিলাতুয যয়ীফা ১/৬৬২)
অথচ ‘জারহে মুব্‌হাম’, ‘জার্‌হে মুফাস্‌সার’ ও ‘জার্‌হে মুবারহান’-এর পার্থক্য নিরূপণে সক্ষম হওয়া শাস্ত্রের প্রাথমিক বিষয়াদির অন্তর্ভুক্ত।
(খ) ‘মুরসাল’এর পারিভাষিক ব্যবহার-সমূহের মধ্যে পার্থক্য করতে না পারায় এমন একটি হাদীসকে মুরসাল আখ্যা দিয়ে তাকে ‘যয়ীফ’ সাব্যস্ত করেছেন যা ‘সহীহ’ ও ‘মামূলবিহী’ হওয়ার ব্যাপারে ‘খাইরুল কুরূন’ এবং পরবর্তী সময়ে সমগ্র উম্মাহর ইজমা রয়েছে। এ বিষয়ে শায়খ আলবানীর মত জানার জন্য দেখুন তাঁর কিতাব ‘ইরওয়াউল গালীল’ ১/১৫৮ এবং হাদীসটির ব্যাপারে সমগ্র উম্মতের অবস্থান জানার জন্য দেখুন ইমাম ইবনে আব্দুল বার রহ.এর কিতাব ‘আলইসতিযকার’ ৮/১০
(গ) কোন কোন ব্যক্তি এই নীতি পেশ করেছেন, কেউ কেউ বাস্তবে তা অনুসরণও করেছেন যে, روي বা এ জাতীয় ‘সিগায়ে মাজহুল’ যয়ীফ বর্ণনার ক্ষত্রে ব্যবহার করা উচিত। কিন্তু শায়খ আলবানী রহ. এ নীতির অর্থ এই নিয়েছেন যে, যিনিই কোন স্থানে ‘সিগায়ে মাজহুল’ ব্যবহার করেছেন তিনিই তা ‘যয়ীফ’ বোঝনোর জন্যই ব্যবহার করেছেন। এজন্য তিনি কিছু সহীহ হাদীসকে যয়ীফ সাব্যস্ত করার ব্যাপারে এ প্রমাণ পেশ করেছেন যে, অমুক ইমাম হাদীসটি ‘সিগায়ে মাজহুল’ দ্বারা উল্লেখ করেছেন। অথচ এটি এমনই ত্রুটি যা একজন সচেতন ছাত্রের পক্ষেও মানানসই নয়। কেননা অসংখ্য সহীহ হাদীস এমন আছে যা বর্ণনা করার সময় কোন না কোন ইমাম বা মুহাদ্দিস ‘সিগায়ে মাজহুল’ ব্যবহার করেছেন। দেখুন আলবানী রহ.এর কিতাব ‘সালাতুত তারাবীহ’; মুহাদ্দিস হাবীবুর রহমান আজমী রহ.এর ‘আলআলবানী শুযূযুহু ওয়াআখতাউহু’ ১/১৬-২০; শায়খ ইসমাঈল আনসারী রহ. রচিত ‘তাসহীহু হাদীসি সালাতিত তারাবীহ’ ২৩-২৪
এখানে কিছু নমুনা পেশ করা হল। অন্যথায় আমার কাছে আলবানী রহঃ এর এ জাতীয় অগভীর ও ত্রুটিপূর্ণ বক্তব্য ও মতামতের এক দীর্ঘ ফিরিস্তি রয়েছে, যা এই সংক্ষিপ্ত পর্যালোচনায় উল্লেখ করা সম্ভব নয়।
তবে এ ব্যাপারে সাধারণ কথা হল, তিনি অনেক ক্ষেত্রে উসূলে হাদিসের বিষয়াদিতে شرح نخبه (শারহে নুখবা) ও الباعث الحثيث (আলবায়িসুল হাসিস) এবং ‘জারহ তাদীল’এর বিষয়াদিতে সিদ্ধান্ত প্রদানের ক্ষেত্রে ‘তাকরীবুত তাহযীব’এর উপর নির্ভর করাকেই যথেষ্ট মনে করেন এবং এতে তিনি কোন ধরণের দ্বিধাবোধ করেন বলে মনে হয় না। শাস্ত্রীয় তাহকীক ও গবেষণার ক্ষেত্রে এর চেয়ে দায়িত্বজ্ঞানহীন নীতি আর কি হতে পারে?
চিন্তা করুন, একটি হাদিসকে তার নিজের ভাষ্য অনুসারে ইমাম আহমাদ বিন হাম্বল, ইমাম বুখারি, ইমাম আবু হাতেম রাযী, ইমাম ত্বহাবী, ইমাম ইবনে হিব্বান প্রমুখ ইমামগণ ‘সহীহ’ বলেছেন; কিন্তু তিনি হাদিসটিকে ‘যয়ীফ’ বলার ব্যাপারে যেন পণ করে বসেছেন। তার বক্তব্য হল হাদিসটির একজন বর্ণনাকারী হলেন শরীক বিন আব্দুল্লাহ আন্‌নাখয়ী। ‘তাকরিবুত তাহযীবে’ আছে তিনি سيء الحفظ এবং سيء الحفظ রাবীর হাদীসকে সহীহ বলা নিয়ম বহির্ভূত। আলবানী রহ. যেন ইমাম বুখারী রহ. সহ এ সকল হাদীস শাস্ত্রের প্রাণপুরুষদেরকে ‘শরহে নুখবা’ ও ‘তাকরীবুত তাহযীব’ পড়াচ্ছেন। তাঁদেরকে হাদীসশাস্ত্রের নিয়মনীতি শিখাচ্ছেন। বলা বাহুল্য হবে না যে, ‘জার্‌হ তাদীল’ ও উসূলুল হাদীস এবং ফিকহুল হাদীসের ব্যাপারে অগভীর জ্ঞানই এ ধরণের প্রগলভতার একমাত্র কারণ। দেখুন সিলসিলাতুল আহাদীসিয যয়ীফা ২/৩৬২-৩৬৪
(২) . ‘তাসহীহ-তাযয়ীফ’ এর ব্যাপারে শায়খ আলবানী রহ. এর অনুসৃত নীতি
শায়খ আলবানী রহ. ‘তাসহীহ-তাযয়ীফ’এর ব্যাপারে তাঁর অনুসৃত নীতি আলোচ্য কিতাবের শুরুতে এভাবে উল্লেখ করেছেন-
ومما ينبغي أن يُذكر بهذه المناسبة أنني لا أقلد أحداً فيما أصدِرُه من الأحكام على تلك الأحاديث، وإنما أتَّبِع القواعد العلمية التي وضعها أهل الحديث، وجرَوا عليها في إصدار أحكامهم على الأحاديث من صحة أو ضعف
ج:١، ص:٤٢
الكتاب: سلسلة الأحاديث الضعيفة والموضوعة وأثرها السيئ في الأمة المؤلف: أبو عبد الرحمن محمد ناصر الدين، بن الحاج نوح بن نجاتي بن آدم، الأشقودري الألباني (المتوفى: 1420هـ) دار النشر: دار المعارف، الرياض - الممكلة العربية السعودية الطبعة: الأولى، 1412 هـ / 1992 م عدد الأجزاء: 14 [ترقيم الكتاب موافق للمطبوع]
অর্থাৎ, তিনি সহীহ-যয়ীফ নির্ণয়ের ব্যাপারে পূর্ববর্তী হাদিস বিশারদ ইমাম বা পরবর্তী হাফিযুল হাদিস গনের কারো অনুসরণ করেন না; বরং আইম্মায়ে হাদীস যে নীতমালার আলোকে হাদীসের ব্যাপারে সিদ্ধান্ত প্রদান করতেন, তিনিও সেসবের অনুসরণ করবেন এবং সরাসরি ওই সব নীতির আলোকেই সিদ্ধান্ত প্রদান করবেন।
প্রশ্ন হয় যদি হাদিস বিশারদ ইমামগণের নীতিমালা অনুসরণ করা বৈধ হয়, তবে সেই সব নীতির আলোকে গৃহীত তাদের সিদ্ধান্ত সমূহের তাকলীদ করা এমন কি দোষের ব্যাপার যে তা থেকে বিরত থাকার ঘোষণা দিতে হয়েছে? অথচ একথা বলাই বাহুল্য যে, যারা এই সব নীতি নির্ধারণ করেছেন, তারাই এর হাকীকত ও প্রয়োগের ব্যাপারে অধিকতর জ্ঞাত।
দ্বিতীয়ত, শায়খ আলবানী রহ. কি হাদিস শাস্ত্রে এই পরিমাণ পাণ্ডিত্য ও পরিপক্বতা অর্জন করেছিলেন, যার ভিত্তিতে আইম্মায়ে কিরামের সিদ্ধান্তসমূহকে পরিত্যাগ করে নিজস্ব বিচার বিবেচনা মোতাবেক সেই সব নীতিমালা প্রয়োগের অধিকার তাঁর জন্মেছে? শাস্ত্রের প্রাণপুরুষ ইমাম –যাঁদের বক্তব্য ও বাস্তব প্রয়োগ থেকেই শাস্ত্রের কায়দাকানুন তৈরি হয়- তাঁদের গবেষণা ও সিদ্ধান্তসমূহের তোয়াক্কা নয়া করে তাদের ‘নিয়ম’ অনুসরণের ভাওতায় নিজস্ব বিভার-বিবেচনা প্রসূত স্বেচ্ছাচারী ‘তাসহীহ-তাযয়ীফ’এর ফলাফল এই দাঁড়িয়েছে যে, তাকে পূর্ববর্তী ইমামগণ এমন কি ইমাম বুখারী ও ইমাম মুসলিমের সাথেও মতানৈক্যে লিপ্ত হতে হয়েছে। সহীহ মুসলিমের প্রায় বিশ বা ততোধিক হাদীসকে তিনি যয়ীফ বলেছেন এবং সহীহ বুখারীর বেশ কিছু হাদীসকেও সরাসরি ‘যয়ীফ’ বা ‘মুনকার’ বলে দিয়েছেন। উদাহরণ স্বরূপ দেখুন সহীহ বুখারীর ২১১৪ ও ২৮৫৫ নং হাদীস। এ দুটি হাদীসকে ‘যয়ীফুল জামিয়িস্‌ সগীর’ ২৫৭৬ ও ৪৪৮৪ নম্বরে যয়ীফ বলেছেন। সহীহ মুসলিমের যেসব হাদীসকে যয়ীফ বলেছেন, তার আলোচনা تنبيه المسلم إلي تعدي الألباني علي صحيح مسلم (তাম্বীহুল মুসলিমি ইলা তাআদ্দিল আলবানী আলা সহীহি মুসলিম)-এ বিদ্যমান রয়েছে। এতে শায়খ আলবানী রহ. এর সিদ্ধান্তের ভ্রান্তি বরং তার দালীলিক আলোচনা পাওয়া যাবে।
যখন এই দুই ইমাম এবং তাদের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ কিতাব দুটির ব্যাপারেই তাঁর অনুসৃত নীতি ও আচরণ এই, তখন অন্যদের ব্যাপারে তাঁর আচরিত নীতির কথা বলাই বাহুল্য।
তৃতীয়ত, যে বিষয়টি এ প্রসঙ্গে সর্বাধিক গুরুত্বপূর্ণ তা হল, ‘উলূমুল হাদীসের; মাঝারি মানের একজন ছাত্রও জানে যে, হাদীসের সহীহ-যয়ীফ নির্ণয় করা হাদীস বর্ণনাকারী রাবীগণের অবস্থা ও অবস্থানের নিরিখে তাদের পর্যায় নির্ধারণ করা, এক কথায় ‘তাসহীহ-তাযয়ীফ’ ও ‘জারহ্‌-তাদীল’এর বহু বিষয় এমন রয়েছে যা খোদ হাদীস বিশারদ ইমামগণের মধ্যেও মতভেদপূর্ণ। প্রশ্ন হয়, এ জাতীয় ক্ষেত্রে শায়খ আলবানী কোন মত বা পথ অবলম্বন করবেন? এ প্রশ্নের স্পষ্ট কোন উত্তর তাঁর বক্তব্যে পাওয়া যায় নয়া। অথচ বিষয়টি অস্পষ্ট ছেড়ে দেয়া উচিত ছিল না।
অপর দিকে তাঁর বাস্তব কর্মক্ষেত্র পর্যবেক্ষণ করে কোন ন্যায়নিষ্ঠ পাঠকের পক্ষে সুনির্দিষ্ট কোন সিদ্ধান্তে উপনীত হওয়া সম্ভব নয়। কেননা এ জাতীয় একাধিক মতপূর্ণ নীতিমালাতে তিনি নির্দিষ্ট কোন অবস্থানে স্থির নন। কোথাও একমত অবলম্বন করেন, অন্যত্র অপর মত। যেমন ‘মাসতূর’-এর হাদীস হুজ্জত হবে কিনা; ইব্‌ন হিব্বানের ‘তাওসীক’ গ্রহণযোগ্য কিনা; হাদীসের ‘তাসহীহ’ দ্বারা রাবীর ‘তাওসীক’ হয় কিনা; ‘যিয়াদাতুস সিকাত’ গ্রহণযোগ্য কিনা ইত্যাদি বিষয়ে শায়খ আলবানী রহ. অনেক যায়গায় স্ববিরোধিতার জন্ম দিয়েছেন। বিস্তারিত জানার জন্য দেখুন শায়খ মাহমূদ সাঈদ মামদূহ রচিত التعريف بأوهام من قسم السنن إلي صحيح و ضعيف (আত্‌তারিফ বিআওহামি মান কসামাস সুনানা ইলা সহীহিউ ওয়া যয়ীফ) ১/২৫ এবং কিতাবের সংশ্লিষ্ট অন্যান্য আলোচনা।
চতুর্থত, হাদীসের ‘সহীহ-যয়ীফ’ নির্ণয়ের জন্য সর্ব প্রথম যে বিষয়গুলো জানতে হয় তার মধ্যে ‘জারহ-তাদীল’ তথা হাদীস বর্ণনাকারীদের সত্যবাদিতা, স্মৃতিশক্তি ও আনুষঙ্গিক অন্যান্য বিষয়ের ব্যাপারে জ্ঞান লাভ করা অন্যতম এবং এরই ভিত্তিতে রাবীদের স্থান ও পর্যায় নির্ণীত হয়, যা ছাড়া হাদীসের সহীহ-যয়ীফ নির্ণয় করা কখনো সম্ভব নয়। প্রশ্ন হল, শায়খ আলবানী রহ. যখন হাদীসের সহীহ-যয়ীফ নির্ণয়ের ব্যাপারে কারো তাকলীদ না করার ঘোষণা দিয়েছেন তখন রাবীর জার্‌হ-তাদীলের ব্যাপারে তাঁর অবস্থান কি হবে? তিনি কি এক্ষেত্রে আইম্মায়ে হাদীসের তাকলীদ করবেন, নাকি জার্‌হ-তাদীলের নীতিমালার আলোকে হাজার বছর আগের রাবীদের সত্যবাদীতা, স্মৃতি শক্তি এবং এ ধরণের আরো হাজারো বিষয়ের যাচাই সরাসরি নিজেই করবেন। এরপর রাবীদের স্থান ও পর্যায় নিরূপণ করবেন? এ প্রশ্নটির স্পষ্ট কোন উত্তর তাঁর বক্তব্যে পাওয়া যায় না। তবে তাঁর বাস্তব কর্ম-ক্ষেত্র লক্ষ করলে দেখা যায়, তিনি কার্যত ‘জারহ্‌-তাদীলের’ ব্যাপারে সাধারণত তাকলীদই করে থাকেন।
প্রশ্ন হয় রাবীর জার্‌হ-তাদীলের ব্যাপারে ইমামগণের তাকলীদ করা যাবে আর হাদীসের ‘তাসহীহ-তাযয়ীফ’এর ক্ষেত্রে তাঁদের তাকলীদ করা যাবে না- এই দ্বৈত নীতির যৌক্তিক কোন কারণ থাকতে পারে কি?
এছাড়া এখানে আরো আফসোসের ব্যাপার হল, শায়খ আলবানী রহ. রাবীদের জার্‌হ তাদীলের ব্যাপারে তাকলীদ করলেও সেটাকে যথাযথ তাকলীদ বলাও কঠিন। কেননা তিনি সাধারণত ‘আসমাউর রিজাল’ ও ‘জার্‌হ তাদীল’এর সংক্ষিপ্ত কিতাবাদির ভিত্তিতেই সিদ্ধান্ত দিয়ে বসেন অথবা দুএকটি মাঝারি ধরণের কিতাবের ভিত্তিতেই স্থির সিদ্ধান্তে উপনীত হয়ে যান। বলা বাহুল্য, তাহকীক ও গবেষণার ক্ষেত্রে এ জাতীয় অবস্থান নিঃসন্দেহে ছেলেমীপনা।
অনেক ক্ষেত্রে এমন হয়েছে যে, তিনি শুধু ‘তাকরীবুত তাহযীব’, ‘খুলাসা’ বা ‘মীযানুল ই’তিদাল’ ইত্যাদি কিতাবের উপর নির্ভর করেই কোন রাবীকে ‘মাজহুল’ বা ‘যয়ীফ’ আখ্যায়িত করেছেন এবং এরই ভিত্তিতে অনেক হাদীসকে ‘যয়ীফ’ আখ্যা দিয়েছেন অথচ তিনি যদি ‘জারহ-তাদীল’এর বিস্তারিত ও দীর্ঘ কিতাবসমূহের সাহায্য নিতেন তবে দেখতেন যে, এসব রাবী গ্রহণযোগ্য এবং তাদের বর্ণিত ওই সকল হাদীসও সহীহ এবং তিনি বুঝতে পারতেন যে, এ ব্যাপারে পূর্ববর্তী ইমামগণের বক্তব্যই সঠিক।
দৃষ্টান্ত স্বরূপ কয়েকজন রাবীর কথা আলোচিত হল:
১. ‘আব্দুল্লাহ বিন যুগ্‌ব’
‘আব্দুল্লাহ বিন যুগ্‌ব’ এর ব্যাপারে মিশকাতের টীকায় (৩/১৫০০) শায়খ আলবানী রহ. লিখেছেন “তিনি মাজহুল”। দলীল হিসেবে বলেছেন, ‘খুলাসা’তে তাঁর ব্যাপারে জার্‌হ-তাদীলের ইমামগণের কারো বক্তব্য উদ্ধৃত হয়নি।
অথচ ‘খুলাসা’র মত সংক্ষিপ্ত কিতাব কেন, আসমাউর রিজালের দশ-বিশটি দীর্ঘ কিতাবেও যদি কারো ব্যাপারে আলোচনা না পাওয়া যায় এবং তার ব্যাপারে কারো সিদ্ধান্ত না পাওয়া যায় তবে তাকে ‘মাজহুল’ আখ্যা দেওয়ার অধিকার শায়খ আলবানী কেন অষ্টম শতাব্দীর হাফিয যাহাবী রহ.এর মত ব্যক্তিত্বেরও নেই। (লিসানুল মীযান ৯/৭৯, তরজমা নং ৮৮৭৭ দ্রষ্টব্য)
অথচ শায়খ আলবানী শুধু এই দলীলে যে, ‘খুলাসা’তে ‘আব্দুল্লাহ বিন যুগ্‌ব’এর ব্যাপারে কোন মন্তব্য বিদ্যমান নেই, তাকে মাজহুল আখ্যা দিচ্ছেন। খোদার বান্দা যদি ‘খুলাসা’র সাথে আরো দুএকটি কিতাবের পাতা ওল্টানো পর্যন্তও ধৈর্য ধরতেন তবুও না হয় একটা কথা হত।
আফসোসের ব্যাপার হল, ‘আব্দুল্লাহ বিন যুগ্‌ব’ সাধারণ কোন রাবী নন, তিনি রসুলুল্লহ সল্লাল্লহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের সাহাবী ছিলেন। فرضى الله عنه وعن جميع الصحابة أجمعين তাঁর ব্যাপারে আলোচনা তারাজিমুস সাহাবা (সাহাবীগণের জীবন-চরিত অভিধান) বিষয়ক কিতাবাদিতে বিদ্যমান রয়েছে। দেখুন, আল ইসাবা ৪/৯৫, ‘উসদুল গাবাহ ২/৬০০।
শায়খ আলবানী রহ. যদি অন্তত ‘তাহযীবুত তাহযীব’ (৫/২১৮) বা ‘তাকরীবুত তাহযীব’ (৩৬০) পড়ে নিতেন তবুও এই মারাত্মক ভ্রান্তিতে নিপতিত হতেন না।
২. ‘ইয়াহইয়া বিন মালিক আলআযদী আবু আইয়ূব আলমারাগী’
তিনি একজন তাবেয়ী এবং সহীহ মুসলিমের একজন রাবী। নাসায়ী, ইব্‌ন হিব্বান, ইজলী, ইব্‌ন সা'দ প্রমুখ তাকে ‘সিকা’ বলেছেন। কিন্তু শায়খ আলবানী রহ. মিশকাতের টীকায় (১/৪৩৮) একটি সনদের ব্যাপারে আলোচনা করতে গিয়ে লিখেন, “ইয়াহ্‌ইয়া ইবন্‌ মালিক আলআযদী ছাড়া সনদের সকল রাবী ‘সিকা’।”
ইয়াহ্‌ইয়া ইবন্‌ মালিক কেন ‘সিকা’ নন? এর উত্তরে তিনি বলেন, “তার ব্যাপারে ‘কিতাবুল জার্‌হ ওয়াত তাদীল’ (৪২/১৯০)এ কোন মন্তব্য উল্লেখ নেই।” ব্যাস এক কিতাবেই তাহকীক শেষ হয়ে গেল। অথচ তিনি ‘তাহযীবুত তাহযীব’ ও ‘তাকরীবুত তাহযীব’ ইত্যাদি কিতাবেও তার আলোচনা পড়ে নিতেন তবে এই তাবেয়ীকে অন্যান্য ‘সিকা রাবী’ থেকে বিচ্ছিন্ন করতেন না।
৩. ‘সাঈদ বিন আশওয়া’
শায়খ আলবানী রহ. إروإء الغليل (ইরওয়াউল গলীল) কিতাবে (৩/১২১) সাঈদ বিন আশওয়া এর ব্যাপারে বলেন, “আমি তার তরজমা বা আলোচনা পাইনি”। অথচ তাঁর আলোচনা ‘তাহযীবুত তাহযীব’ (৪/৬৭), ‘তাকরীবুত তাহযীব'’ (২৮৫) ছাড়াও আরো কিতাবেই রয়েছে। তাছাড়া তিনি সহীহ বুখারী ও সহীহ মুসলিমের মত প্রসিদ্ধ কিতাব দুটির রাবী। তাঁর পুরো নাম সাঈদ বিন আমর বিন আশওয়া।
মোটকথা এ এক লম্বা ফিরিস্তি। এক দুই কিতাবের দুচার পৃষ্ঠা উল্টিয়েই কোন ‘সিকা’ বা ‘মারূফ’ রাবীকে, ‘যয়ীফ’ বা ‘মাজহুল’ বলে দেওয়া; তেমনি এক দুই কিতাব থেকে কোন ইমামের সিদ্ধান্ত অপূর্ণভাবে উল্লেখ করে, রাবীর ব্যাপারে ভুল মন্তব্য করা বা যথাযথভাবে রাবীর আলোচনা তালাশ না করেই 'তার আলোচনা পেলাম না' বলে দেওয়া ইত্যাদির বহু দৃষ্টান্ত শায়খ আলবানীর রচনাবলীতে পাওয়া যায়।
লজ্জার ব্যাপার হল, যখন তাঁকে এসব বিষয়ে সতর্ক করা হল তখন তাঁর অতিভক্ত লোকেরা তাঁর পক্ষ থেকে এই ওযর পেশ করল যে, “শায়খের 'নাশাত' হয়নি।” (অর্থাৎ, অনেক কিতাব থেকে সংশ্লিষ্ট বিষয়টি তাহকীক করতে তাঁর তবীয়তে চায়নি।) এজন্য তিনি ‘তাকরীবুত তাহযীব’এর উপর নির্ভর করেই সিদ্ধান্ত দিয়ে দিয়েছেন। দেখুন, আলী আল হালাবী রচিত إحكام المبانى (ইহ্‌কামুল মাবানী) ৩৬, ৪১, ৭৬।
এই ওযরখাহি থেকে এছাড়া আর কি অর্থ বের হয় যে, শায়খ আলবানী রহ. তাহকীক করা ছাড়াই তাঁর ‘তবীয়তসম্মত’ পদ্ধতিতে সিদ্ধান্ত দিয়ে দেন; যদিও সিদ্ধান্তটি পূর্ববর্তী ইমামগণের বিরোধীই হোক না কেন। লড়াই হবে ফন ও শাস্ত্রের ইমামগণের সাথে আর হাতিয়ার হবে ‘তাকরীবুত তাহযীব’ বা তারও পরের কোন কিতাব! কী অদ্ভুত ব্যাপার!
৩. শায়খ আলবানীর স্ববিরোধিতা
হাদীসের ‘তাসহীহ-তাযয়ীফ’, রাবীর ‘জারহ্‌-তাদীল’ এবং শাস্ত্রীয় নিয়ম-কানুন প্রয়োগের ক্ষেত্রে শায়খ আলবানীর স্ববিরোধীতার বিষয়টিও অবহেলা করার মত নয়। অনেক ক্ষেত্রেই এমন হয়েছে যে, একস্থানে একই হাদীসকে ‘সহীহ’ বা ‘হাসান’ বলে বসেছেন। কোথাও কোন রাবীকে ‘সিকা’ (নির্ভরযোগ্য) বলেছেন, আবার অন্যত্র তাকেই যয়ীফ বা অগ্রহণযোগ্য আখ্যা দিয়েছেন। একাধিক মতসমৃদ্ধ নীতিমালা ও ক্ষেত্রসমূহে কখনো একটি মতসমৃদ্ধ নীতিমালা ও ক্ষেত্রসমূহে কখনো একটি মত অবলম্বন করেছেন, আবার কখনো অন্য মত।
তাঁর এই স্ববিরোধী সিদ্ধান্তসমূহের কিছু এমন হয়ে থাকবে যাতে তাঁর মত পরিবর্তিত হয়েছে। কোন হাদীস বা রাবীর ব্যাপারে পূর্বে তাঁর ধারণা এক রকম ছিল; পরে তাতে পরিবর্তন এসেছে। এ জাতীয় বিষয়াদিকে শায়খ আবুল হাসান মুহাম্মাদ তাঁর تراجع العلامة الألبانى فيما نص عليه تصحيحا وتضعيفا কিতাবে উল্লেখ করেছেন। এতে সর্বমোট ২২২টি হাদীস স্থান পেয়েছে।
কিন্তু অনেক ক্ষেত্রে এমনও রয়েছে যেখানে তাঁর এই স্ববিরোধিতা মত পরিবর্তনের কারণে নয়; বিস্মৃতি বা অবহেলার কারণে হয়েছে। এছাড়া কিছু স্থান এমনও আছে যেখানে তাঁর বক্তব্যের পূর্বাপর থেকে স্পষ্ট হয়ে যায় যে, এই স্ববিরোধিতার পিছনে আসাবিয়্যাত তথা পক্ষপ্রবণতার প্রভাব রয়েছে; যদিও তিনি নিজেকে আসাবিয়্যাতের ঘোর বিরোধী হিসেবে প্রকাশ করে থাকেন এবং প্রায়ই ন্যায়নিষ্ঠ আলেমগণের প্রতি আসাবিয়্যাতের অপবাদ আরোপ করতেও তাঁকে দেখা যায়।
শায়খ হাসান সাক্কাফ রচিত تناقضات الألبانى الواضحات (আলবানীর সুস্পষ্ট স্ববিরোধীতাসমূহ) আমরা কিতাবটির আকণ্ঠ সমর্থক নই এবং তাঁর উপস্থাপনার সাথেও একমত নই, তবে তাঁর অতিরঞ্জন গুলো বাদ দিয়ে যদি শায়খ আলবানীর স্ববিরোধীতা গুলোও আলোচনা করা হয় যা অন্যান্য ন্যায়নিষ্ঠ আহলে ইলমের আলোচনাতেও রয়েছে, তবে তার সংখ্যা কম হবে না, প্রচুর।
৪. ইজতেহাদী বিষয়াদিতে অসহিষ্ণুতা
এ বিষয়টি শাস্ত্রজ্ঞ ইমামগণের কাছে ঐক্যমত্যপূর্ণভাবে স্বীকৃত যে, হাদীস ভাণ্ডারে বিদ্যমান হাদীসসমূহের ‘সহীহ’ বা ‘যয়ীফ’ হওয়া বিবেচনায় তিন ভাগে বিভক্ত। যথা:
1.যেসব হাদীস সহীহ হওয়ার ব্যাপারে সকল ইমাম একমত হয়েছেন।
2.যেসব বর্ণনা ‘যয়ীফ’ বা ‘মাতরূক’ (পরিত্যাজ্য) হওয়ার ব্যাপারে সকল ইমাম একমত হয়েছেন।
3.যা ‘সহীহ’ বা ‘যয়ীফ’ হওয়ার ব্যাপারে ইমামগণের মধ্যে মতানৈক্য দেখা দিয়েছে।
বাস্তবতার নিরিখেও হাদীসের এই প্রকার তিনটি সুস্পষ্ট। এর মধ্যে প্রথম দুই প্রকার হাদীসের বিষয়টি সহজ ও পরিষ্কার। কিন্তু শায়খ আলবানী রহ. তাঁর ‘সিলসিলাতুল আহাদীস’কে এই (প্রথম) দুই প্রকারে সীমাবদ্ধ রাখেননি। তিনি যথারীতি শেষোক্ত হাদীসও প্রচুর পরিমাণে উল্লেখ করেছেন।
এ তৃতীয় প্রকারের হাদীসের ব্যাপারে শাস্ত্র ও বিবেকের সিদ্ধান্ত হল, ‘আহ্‌লে ফন’ বা শাস্ত্রজ্ঞ ব্যক্তি তাহকীক ও গবেষণার ভিত্তিতে যে সঠিক বা বিশুদ্ধ মনে করবেন, তিনি সেই মতকে অবলম্বন করবেন। আর যারা এই শাস্ত্রে বিশেষজ্ঞ নন তারা কোন শাস্ত্রজ্ঞের তাকলীদ বা অনুসরণ করবেন। তবে অনুসরণের ক্ষেত্রে লক্ষ রাখতে হবে মতটি যেন ‘পণ্ডিতের পদস্খলন’ না হয়।
ইমাম বাইহাকী (মৃত্যু ৪৫৮হি.) তাঁর "দালাইলুন নবুওয়্যাহ" কিতাবের ভূমিকায় এ বিষয়টি উল্লেখ করেছেন-
وأما النوع الثالث، من الأحاديث فهو حديث قد اختلف أهل العلم بالحديث في ثبوته: فمنهم من يضعفه بجرح ظهر له من بعض رواته خفى ذلك عن غيره، أو لم يقف من حاله على ما يوجب قبول خبره، وقد وقف عليه غيره، أو المعنى الذي يجرحه به لا يراه غيره جرحا، أو وقف على انقطاعه أو انقطاع بعض ألفاظه، أو إدراج بعض رواته قول رواته في متنه. أو دخول إسناد حديث في حديث خفى ذلك على غيره.
فهذا الذي يجب على أهل العلم بالحديث بعدهم أن ينظروا في اختلافهم، ويجتهدوا في معرفة [ (89) ] معانيهم في القبول والردّ، ثم يختاروا من أقاويلهم أصحّها. وبالله التوفيق.
উম্মাহর আলেমগণের কর্মনীতিও আজ পর্যন্ত এ-ই ছিল। এ প্রকারের হাদীসসমূহে বিশেষজ্ঞদের মতপার্থক্য যেহেতু খুব স্বাভাবিক ব্যাপার, তাই প্রত্যেকেই অপরের মতের প্রতি সহিষ্ণু রয়েছেন। যার বিচার-বিবেচনায় হাদীসটি সহীহ সাব্যস্ত হয়, তিনি মাসাআলার ভিত্তিরূপে হাদীসটিকে গ্রহণ করেন। আর যার বিচার বিবেচনায় হাদীসটি সহীহ সাব্যস্ত হয় না তিনি মাসাআলার ভিত্তি হিসেবে একে গ্রহণ করেন না। এ ক্ষেত্রে গ্রহণ-অগ্রহণ উভয়ই হয় ইজতিহাদের ভিত্তিতে। আর এজন্যই প্রত্যেককে অপর মতের ব্যাপারে শ্রদ্ধাশীল বা অন্তত সহিষ্ণু হতে হয়। আমাদের পূর্ববর্তী ইমামগণ এমনই ছিলেন।
এখানে এ বিষয়টি স্পষ্ট যে, যিনি হাদীসটি গ্রহণ করেছেন আর যিনি গ্রহণ করেননি, তিনিও এজন্যই গ্রহণ করেননি যে, তাঁর বিবেচনায় হাদীসটি সহীহ নয়। এখন কেউ যদি প্রথমোক্ত ব্যক্তির ব্যাপারে এই অভিযোগ দায়ের করে যে, তিনি যয়ীফ হাদীস গ্রহণ করেন অথবা শেষোক্ত ব্যক্তিকে এই বলে অভিযুক্ত করে যে, তিনি সহীহ হাদীস পরিত্যাগ করেন তাহলে এটা হবে নিছক একটি চাতুরীপূর্ন বক্তব্য। এ জাতীয় অবস্থান পরিহার করাই ইলমী শিষ্টাচারের দাবী। কিন্তু দুঃখজনক হলেও সত্য যে, আলবানী রহ. ও তাঁর অন্ধভক্তদের পক্ষে তা পরিহার করা সম্ভব হয়নি।
আর এ জাতীয় ক্ষেত্রে নিজের মতকে চূড়ান্ত মনে করা বা যথাযথ দলীলভিত্তিক সমালোচনার ব্যাপারে অসহিষ্ণু হওয়া এবং সমালোচককে গালিগালাজ করা কিংবা নিজের সিদ্ধান্তকে অন্য সকলের উপর চাপিয়ে দেয়ার মানসিকতা পোষণ করা –এসবই যে অত্যন্ত গর্হিত কাজ এবং শরীয়তের রুচিপ্রকৃতি ও ইখতিলাফের ক্ষেত্রে অনুসরণীয় রীতিনীতির সম্পূর্ণ পরিপন্থী তা তো বলাই বাহুল্য। অত্যন্ত দুঃখের সাথেই বলতে হয়, শায়খ আলবানী রহ. ও তাঁর বিশিষ্ট ভক্ত-অনুরক্তদের পক্ষে উপরোক্ত নীতিমালা অনুসরণ করা সম্ভব হয়নি। নিজের সিদ্ধান্তসমূহের ব্যাপারে খোদ শায়খ আলবানী রহ.এরই অতিরিক্ত সুধারণা ছিল। তাঁর রচনাবলী পাঠ করলে একজন সাধারণ পাঠকের মনে এ ধারণাই সৃষ্টি হয়। বিশেষত তাঁর রচনা صفة صلاة النبى صلى الله عليه وسلم التكبير إلي التسليم، كأنك تراها এর নামটিই লক্ষ করুন অথবা এর ভূমিকা পড়ুন কিংবা তাঁর অন্যান্য রচনা যথা غاية المرام في تخريج أحاديث الحلال والحرام এর ভূমিকা দেখুন। বিষয়টি একদম স্পষ্ট হয়ে যাবে। বরং তাঁর সেসব বক্তব্য থেকে এই ভাব প্রকাশ পায় যে, তিনি যেন তাঁর সিদ্ধান্তসমূহ মেনে নিতে মানুষকে বাধ্য করতে চাচ্ছেন! অথচ ইজতিহাদী বিষয়ে এই অবস্থান কখনো কাম্য নয়।
সিলসিলাতুয্‌ যয়ীফা, সিলসিলাতুস সহীহা বরং তাঁর অন্যান্য রচনার ভূমিকা পড়লে একজন নিরপেক্ষ পাঠকের মনে এ ধারণাই সৃষ্টি হয় যে, তাঁর সিদ্ধান্তের সাথে একমত না হওয়াই একটি অমার্জনীয় অপরাধ এবং এই অপরাধে অপরাধী ব্যক্তি তাঁর পক্ষ থেকে যেকোনো ধরণের সম্বোধনের উপযুক্ত হতে পারে।
শায়খ ইসমাঈল আনসারী রহ. যিনি প্রসিদ্ধ সালাফী আলেম এবং রিয়াদ কেন্দ্রীয় দারুল ইফ্‌তার একজন গবেষক ছিলেন তিনিও এই অপরাধে তাঁর পক্ষ থেকে ‘সুন্নাহ্‌র দুশমন’ উপাধিতে ভূষিত হয়েছেন।
উম্মাহ্‌র অন্যান্য মনিষী যারা তাঁর মাসলাক ও মাশরাবের সাথেও একমত নন, তাঁদের সাথে তাঁর আচরণ কেমন হবে তা তো বলাই বাহুল্য।
[আকমাল হোসাইন সাহেব এক হিসেবে ভালোই করেছেন যে, ‘সিলসিলাতুয যয়ীফা’র মুকাদ্দমা অনুবাদ করেননি। তার এ কাজটি যদিও অনুবাদনীতির পরিপন্থী; কিন্তু এতে অন্তত শায়খ আলবানীর ওই সব জবরদস্তিগুলো তো সাধারণ পাঠকদের কাছ থেকে গোপন থাকল! ]
এ পর্যায়ে এসে স্বভাবতই যে প্রশ্নটি উদ্রেক হয়, যিনি নিজেকে পূর্ববর্তী ও পরবর্তী সকল ইমামের সমালোচনা-পর্যালোচনার উপযুক্ত মনে করেন এবং তাঁদের সকলের রচনাবলীর উপর কর্তৃত্ব চালানোকে নিজের অধিকার জ্ঞান করেন তিনি অন্যের সমালোচনায় অস্থির হবেন কেন? সমালোচকের সমালোচনা ঠাণ্ডা মাথায় অনুধাবন করে যদি তা প্রত্যাখ্যানই করতে হয় তবে যথাযথ আদব ও ভাবগাম্ভীর্যের সাথেও তো প্রত্যাখ্যান করা যায়। এজন্য কটু-বাক্যের আশ্রয় নেয়া তো কোনভাবেই যুক্তিযুক্ত নয়।
অপরদিকে এও তো বাস্তব সত্য যে, খোদ শায়খ আলবানী রহ.এর সমালোচনাগুলো অনেকটাই বিচারকসুলভ। এক্ষেত্রে বড় ছোটর তেমন কোন প্রভেদ তাঁর কাছে নেই।
তিনি ইমাম বুখারী রহ.এর ‘আলআদাবুল মুফরাদ’ কিতাবটিকেও দুই টুকরো করেছেন। তিনি যেন ইমাম বুখারী রহ.কেই শিখাচ্ছেন, ‘জনাব, এ কিতাবে এই হাদীসগুলো আনা সমীচীন হয়নি।’ এমনকি সহীহ বুখারীর কিছু হাদীসকেও তিনি যয়ীফ বলেছেন। সহীহ মুসলিমের অনেক হাদীসের ব্যাপারে ‘মুখতাসারু সহীহ মুসলিম লিল মুনযিরী’এর টীকায় আলোচনা করে তা যয়ীফ বা ‘মালূল’ সাব্যস্ত করার চেষ্টা করেছেন। ইমাম আবু দাউদ, ইমাম তিরমিযী, ইমাম নাসায়ী এঁদের প্রত্যেকের কিতাবকে দুই টুকরো করে ‘সহীহু আবী দাউদ’, ‘যয়ীফু আবী দাউদ’, ‘সহিহুত তিরমিযী’, ‘যয়ীফুত তিরমিযী’, ‘সহীহুন নাসায়ী’, ‘যয়ীফুন নাসায়ী’ তিন কিতাবকে ছয় কিতাব বানিয়ে দিয়েছেন।
তাঁর এ কাজে কী কী ত্রুটি রয়েছে, এর কী মন্দ প্রভাব ইলমী ও আমলী ময়দানে পড়ছে এবং সালাফদের রচনাবলীর সাথে তাঁর মত ব্যক্তির জন্য এ ধরণের বিচারকসুলভ আচরণের কোন বৈধতা আছে কিনা? এসব বিষয়ে অন্য কোন অবসরে আলোচনা করা যাবে। এখানে শুধু এতটুকুই আরজ করতে চাই যে, উম্মাহর হাফিযুল হাদীস ও মহান ইমামগণের ব্যাপারে এমন দুঃসাহসিকতাপূর্ণ পথে সমালোচনা ও পর্যালোচনার পর অপারপর পর্যালোচকদের ব্যাপারে তাঁর এ আচরণ, যার প্রতি ইতিপূর্বে ইঙ্গিত করা হয়েছে কোনক্রমেই বোধগম্য নয়।
৫. যয়ীফ হাদীসের ব্যাপারে শায়খ আলবানীর অবস্থান
শায়খ আলবানী রহ. ‘যয়ীফ হাদীস’কে একদম অনর্থক মনে করেন। তাঁর মতে যয়ীফ হাদীসের কোন প্রকার কোন ক্ষেত্রেই গ্রহণযোগ্য নয়। তিনি যয়ীফ ও মওযূ উভয়টাকে একই শ্রেণীর অন্তর্ভুক্ত করেছেন এবং উচ্চকণ্ঠে এ ঘোষণা দিয়েছেন যে, যয়ীফ সর্বক্ষেত্রেই পরিত্যাজ্য। এটা না ফাযায়েলের ক্ষেত্রে গ্রহণযোগ্য, না মুস্তাহাব বিষয়াদির ক্ষেত্রে, অন্য কোন ক্ষেত্রে। -সহীহুল জামিইস সগীর ওয়া যিয়াদাতিহী, পৃ:১৫০
অথচ এ মতটি সলফ ও সলাফুস সলেহীনের ঐক্যমত্যপূর্ণ নীতিমালার বিরোধী। জমহুরে সলফ ও খলফের ‘ইজমা’ বা ঐক্যমত্যের খেলাফ হওয়া তো অতি স্পষ্ট এবং সর্বজন বিদিত। বাস্তব কথা হল, তা সকল সলফ ও খলফের ইজমারই পরিপন্থী। এ ব্যাপারে কোন কোন মনিষী থেকে ভিন্নমত কোন কোন কিতাবে বর্ণিত হয়েছে তা নির্দিষ্ট প্রকারের যয়ীফ হাদীসের ব্যাপারে অথবা যয়ীফ হাদীসের দ্বারা আহকাম বা বিধিবিধানের ক্ষেত্রে প্রমাণ গ্রহণ করার ব্যাপারে। যয়ীফ কোন কাজের নয় –এই মত যা শায়খ আলবানী অবলম্বন করেছেন, সলফ ও খল্‌ফের কেউ তা পোষণ করতেন না।
তাঁর এ মতটি ইমাম বুখারী রহ. তাঁর মাশায়েখ, সমসাময়িক ইমাম ও শিষ্যবৃন্দের এবং পূর্ববর্তী ইমামগণের ইজমায়ী মতকে দলীলহীন বা দলীলের পরিপন্থী বলা শুধু যে অন্যায় দুঃসাহসিকতা প্রদর্শন তাই নয়, তা শাস্ত্রীয় জ্ঞানের অপ্রতুলতারও একটি জ্বলন্ত প্রমাণ।
এ বিষয়ে যয়ীফ হাদীস সংক্রান্ত আলোচনার প্রসিদ্ধ উৎসসমূহ ছাড়াও নিম্নোক্ত কিতাবসমূহ দেখা যেতে পারে-
ثلاث رسائل في استحباب المترات جمع الشيخ عبد الفتاح أبو غدة ١٠٠-١٠٤
حفر الأح للشيكه عبد الحي اللكوي بحائبة واستدرأكت الشيكه عبد الفتاح أبو غدة ١٨١-٢٠٦
الئقول السطيع للسحاوي بقلم الشيخ محمد عو امة حي ٤٢٢-٤٧٣
أثر الحديث الشريف للشيخ محمد عوامي ٣٢-٣٧
التعريف بأوهام من قسم السنن إلي صحيح و ضعيف للشيخ محمود سعد ممدوح
৬. ‘শুযূয’ তথা ইজমায়ে উম্মত থেকে বিচ্যুতি......
শায়খ আলবানী রহ.এর কাজকর্মের আরেকটি মৌলিক দিক হল, তাঁর আলোচনা-পর্যালোচনা শুধু হাদীসের তাসহীহ ও তাযয়ীফের মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকেনি; তিনি তাঁর রচনাসমূহের বিভিন্ন স্থানে ফিক্‌হ, আকায়েদ ও অন্যান্য শাস্ত্রের বিভিন্ন বিশয়ে স্বাধীন বরং এক ধরণের বিচারকসুলভ পর্যালোচনা করতে থাকেন এবং এ ব্যাপারে তিনি এতটাই নিঃশঙ্কচিত্ত যে, বহু বিষয়ে ‘শুযূয’ (شذوذ) অবলম্বন করতেও দ্বিধাবোধ করেননি। অথচ ইজমায়ে উম্মত ও খুলাফায়ে রাশেদীনের যুগ থেকে চলে আসা উম্মাহর অবিচ্ছিন্ন কর্মধারা থেকে বিচ্ছিন্ন কোন মত পোষণ করা অথবা পূর্ববর্তী কোন মনিষীর ভ্রান্তি বা বিচ্ছিন্ন সিদ্ধান্ত কে পুনরায় জীবিত করা কোন ইলমী খেদমত নয়। ইলমী ক্ষেত্রে ‘শুযূয’ অবলম্বন করা হতে বিরত থাকার মধ্যেই একজন আলেমের আত্মমর্যাদা ও তাকওয়ার পরিচয়টি লুকায়িত থাকে।
এ জাতীয় মত ও পথ (শুযূয) অবলম্বন করা বা কোন মনিষীর ভ্রান্তির অনুসরণ করা যে অত্যন্ত জঘন্য অপরাধ এ ব্যাপারে শরিয়তের প্রমাণাদি, সাহাবায়ে কেরাম, তাবেয়ীন এবং পরবর্তী আসলাফে উম্মাহ্‌র সিদ্ধান্ত ও বক্তব্য আহলে ইলমের অজানা নয়। এ প্রসঙ্গে ইবন্‌ আব্দুল বার রহ. (মৃ: ৪৬৩ হি.) এর جامع بيان العلم ২/১৩০ এবং ইবন্‌ রজব দামেস্কী রহ. (মৃ: ৭৯৫ হি.) এর شرح علل الترمذي বিশেষভাবে অধ্যয়নযোগ্য।
যেসব ভ্রান্তি বা বিচ্ছিন্ন মতের উদ্ভাবন কিংবা পৃষ্ঠপোষকতা শায়খ আলবানী রহ. করেছেন তার কিছু দৃষ্টান্ত নিম্নে উদ্ধৃত হলঃ
১. তাঁর মতে মহিলাদের জন্য স্বর্ণের আংটি ও অন্যান্য ‘স্বর্ণবলয়’ ব্যবহার করা হারাম।
তাঁর মতে মহিলাদের জন্য স্বর্ণের আংটি ও অন্যান্য ‘স্বর্ণবলয়’ ব্যবহার করাকে হারাম। অথচ মহিলাদের জন্য যেকোনো ধরণের স্বর্ণালঙ্কার ব্যবহার করা তা বলয়াকৃতিরই হোক যেমন, গলার হার, লকেট ইত্যাদি বৈধ হওয়ার ব্যাপারে উম্মাহ্‌র ইজমা প্রতিষ্ঠিত আছে এবং দলীল দ্বারাও তাই প্রমাণিত। চিন্তার বিষয় হল, বলয়াকৃতির অলঙ্কার আর বিছানো অলঙ্কারের মধ্যে এমন কি পার্থক্য যে, একটা হালাল হবে আর অপরটা হারাম হবে?
এ মাসাআলায় শায়খ আলবানী রহ.এর বিচ্ছিন্ন মতটির ভ্রান্তি প্রমাণ করার জন্য শায়খ ইসমাঈল আনসারী (সাবেক গবেষক, কেন্দ্রীয় দারুল ইফ্‌তা, রিয়াদ, সৌদি আরব) إباحة التحلي بالذهب المحلق للنساء নামে একটি স্বতন্ত্র কিতাবই রচনা করেছেন।
২. আট রাকাআত তারাবীহ সুন্নাত ও বিশ রাকাআত তারাবীহকে বিদ’আত আখ্যা দেয়া।
আট রাকাআত তারাবীহ সুন্নাত ও বিশ রাকাআত তারাবীহকে বিদ’আত আখ্যা দেয়া। অথচ বিশ রাকাআত তারাবীহকে বিদ’আত আখ্যা দেওয়া গর্হিত কাজ। আমার জানা মতে আরবে এই ভ্রান্ত বিদ’আতী মতবাদের সূচনা শায়খ আলবানীর আগে আর কেউ করেননি। ইংরেজ শাসনামলে কোন লা-মাযহাবী মৌলভী এই মতবাদের সূচনা করলে বিশিষ্ট লা-মাযহাবী আলেমরাই এর প্রতিবাদ করেন।
শায়খ আলবানী এই ‘শায’ মতটির ভ্রান্তি প্রমাণে লিখিত শায়খ ইসমাঈল আনসারী রহ. এবং শায়খ মুহাম্মাদ আলী সাবূনী (উস্তাদ, জামি’আ উম্মুল কুরা, মক্কা মুকার্‌রমা)এর কিতাবসমূহ অধ্যয়ন করাই যথেষ্ট হবে।
৩. তাঁর মতে এক মজলিসে তিন তালাক দেওয়া হলে তা এক তালাক গণ্য হবে।......
তাঁর মতে এক মজলিসে তিন তালাক দেওয়া হলে তা এক তালাক গণ্য হবে। (ইরওয়াউল গলীল ৭/১২২) অথচ এই মতটি সহীহ হাদীস ও ‘খাইরুল কুরূন’এর ইজমা পরিপন্থী। এ বিষয়ে সৌদি আরবের কেন্দ্রীয় দারুল ইফ্‌তা থেকে প্রকাশিত কিতাব مجلة البحوث الإسلامية (المجلد الأول، العدد الثالث سنة حكم الطلاق الثلاث-١٢٩٧) এ অন্তর্ভুক্ত গ্রন্থে দেখা যেতে পারে। এতে উপরোক্ত বিচ্ছিন্ন মতটির বিপরীতে বহু হাদীস ও সহীহ আসার উল্লেখ করা হয়েছে।
৪. নামাযের যে পদ্ধতি শায়খ আলবানী রহ. তাঁর কিতাব صفة الصلاة النبي صلي الله عليه و سلم এ উল্লেখ করেছেন একমাত্র একেই ‘নববী নামায’ আর হাদীস ও আসারের সুবিশাল ভাণ্ডারে নামাযের অন্য যেসব পদ্ধতি বর্ণিত হয়েছে সবগুলোকেই বিদ’আতী নামায ও রসুলুল্লাহ সল্লাল্লহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের সুন্নাত-বিচ্যুত নামায আখ্যা দেয়া।
এটা এতটাই ভয়ংকর বিচ্যুতি যে, এ ব্যাপারে যত নিন্দাবাদই করা হোক তা অতিঅল্প। এ মতবাদটি প্রচার-প্রসার الفساد فى الأرض তথা ‘জমিনে ফ্যাসাদ সৃষ্টি’র অন্তর্ভুক্ত হওয়ার মধ্যে কোন সন্দেহ নেই।
হাদিস ও আসারের সুবিশাল ভাণ্ডার থেকে নিজস্ব ইজতিহাদের ভিত্তিতে কিছু হাদীস বাছাই করা, এরপর নিজের পক্ষ থেকে তার শর্‌হ ও ব্যাখ্যা প্রদান করে একে অকাট্যরূপে ‘নববী নামায’ দাবি করা এবং পূর্ববর্তী ইমামগণের পক্ষ থেকে উপস্থাপিত নামাযের অন্যান্য পদ্ধতিকে নববী নামায থেকে বহির্ভূত আখ্যা দেয়া এবং নিজের ইজতিহাদ ও চিন্তা-ভাবনার ভিত্তিতে নির্বাচিত নামায-পদ্ধতিকে ওহীর মত সকল মুসলিমের উপর চাপিয়ে দেয়ার প্রচেষ্টা যে ইলমী ময়দানে কত বড় বিচ্ছিন্নতাবাদ এবং إحناث في الدين এর কত জঘন্য ও ভয়ানক রূপ, একমাত্র মুহাক্কিক ও ন্যায়নিষ্ঠ আলেমগণই তা আন্দাজ করতে পারবেন।
এ প্রসঙ্গে বিস্তারিত ও দলীল ভিত্তিক তথ্য ও আলোচনার প্রয়োজন হলে মারকাযুদ্দাওয়া আলইসলামিয়্যা ঢাকা থেকে প্রকাশিতব্য নামায-পদ্ধতি বিষয়ক কিতাবটির সাহায্য নেয়া যেতে পারে।
৫. সুব্‌হাহ (তাসবীহ) যা দ্বারা গণনা করা হয়, তাকে বিদ’আত আখ্যা দেয়া।
সুব্‌হাহ (তাসবীহ) যা দ্বারা গণনা করা হয়, তাকে বিদ’আত আখ্যা দেয়া। (সিলসিলাতুল আহাদীসিয যয়ীফা ১/১৮৫-১৯৩) অথচ এর ব্যবহার জায়েয হওয়ার ব্যাপারে এতটুকুই যথেষ্ট যে, এর নিষিদ্ধ হওয়ার কোন দলীল নেই। তারপরও শরয়ী দলীল দ্বারা এর ব্যবহার জায়েয বলে প্রমাণিত। পূর্ববর্তীদের কেউই একে বিদ’আত বলেননি। বিদ’আতের শরয়ী অর্থ সম্পর্কে যার স্পষ্ট ধারণা নেই, একমাত্র এমন ব্যক্তিই তাস্‌বীহ ব্যবহার করাকে বিদ’আত বলতে পারে। আলবানী সাহেবের এ মতটি খণ্ডনে শায়খ ইসমাঈল আনসারী রচিত وصول التهاني بإ ثْات سنية السبحة والرد على الألباني কিতাবটি পড়া যেতে পারে।
ফিক্‌হ, ইলমে হাদীস ও অন্যান্য বিষয়ে শায়খ আলবানী রহ. এর শায মতামতের সংখ্যা প্রচুর। এখানে যে বিষয়টি উল্লেখ্য তা হল, জনাবের তাসহীহ-তাযয়ীফের উদ্দেশ্য শুধু হাদীস যাচাই-বাছাই মানুষের জন্য সহজ করা নয়; বরং পর্দার অন্তরালে মানুষকে ‘নাক্‌দুস সালাফ’ ও ‘ফিক্‌হুস সালাফ’ তথা সলফের তাসহীহ-তাযয়ীফ ও ফিক্‌হ থেকে সরিয়ে ‘নাক্‌দুল আলবানী’ ও ‘ফিক্‌হুল আলবানী’এর তাকলীদে নিয়োজিত করা। কথাটা তিক্ত হলেও বাস্তব সত্য। কার্যক্ষেত্রে এমনই হচ্ছে।
যদি ব্যাপারটা এমন না হত বরং তাসহীহ ও তাযয়ীফের ব্যাপারে আলেম ও তালেবে ইলমদেরকে তথ্য সরবরাহ করা এবং নিজের মতামতকে দালীলিকভাবে পেশ করে দেয়াই উদ্দেশ্য হত তবে হাদীস ও রেওয়ায়াতসমূহের উপর আলোচনা করতে গিয়ে আইম্মায়ে হাদীস এবং পূর্ববর্তী হুফ্‌ফাযে হাদীসের উপর আক্রমণ করার প্রয়োজনীয়তা ছিল না। ফিক্‌হ ও ফকীহগণের ব্যাপারে মানুষকে আস্থাহীন করারও প্রয়োজন ছিল না যা তার রচনাবলীর মধ্যে লজ্জাকর ভাবে বিদ্যমান। সবিশেষ বিচ্ছিন্ন মতামতসমূহের তরফদারি এবং নতুন নতুন মতের জন্ম দেয়ারও প্রয়োজন ছিল না। অথচ এসব বিষয়েই তাঁর অন্ধ ভক্ত-অনুরক্তদের দৃষ্টিতে তাঁর কিতাবের মূল আকর্ষণ। বলাবাহুল্য, একজন বিশেষ ব্যক্তির (তাঁর ব্যক্তিত্ব যত উঁচুই হোক না কেন) সিদ্ধান্ত ও পর্যালোচনাকে পূর্ববর্তী সকল ইমামের হাদীস ও ফিক্‌হের অবদানসমূহের উপর আরোপিত করা এবং তাদের সবার শুদ্ধাশুদ্ধি পরীক্ষার জন্য একেই একমাত্র কষ্টিপাথর মনে করা অন্ধ তাকলীদের এবং অনধিকার চর্চার একটি জঘন্যতম রূপ।
৭. শায়খ আলবানীর ভ্রান্তিসমূহের খণ্ডনে নির্ভরযোগ্য আলেমগণের কিছু কিতাব।
1.মুহাদ্দিস হাবীবুর রহমান আযমী রহ কৃত الألباني شذوذه وأختناؤه.
2.শায়খ ইসমাঈল আনসারী (সাবেক গবেষক, কেন্দ্রীয় দারুল ইফ্‌তা, সৌদি আরব) কৃত تصحيح صلاة التراويح عشرين ركعة والرد على الألباني ءي تضعيفه
3.শায়খ ইসমাঈল আনসারী রহ কৃত إباحة التحلي بالذهب المحلق للنساء الرد على الألباني في تحريم.
4.শায়খ হামুদ তুয়াইজারী (সৌদি আরব) কৃতالعارم المشهور على أهل التبرج والسفور، وءيه الرد على كتاب الحجاب للألباني
5. আবু মুয়াজ তারেক বিন আউযুল্লাহ (বিশেষ ছাত্র, শায়খ আলবানী রহ.) কৃতالنقد البناء أسماء في كشف الوجه الكفين للنساء
6.আহমাদ আব্দুল গফুর কৃত ويلك آمن
7.মাহমূদ সাঈদ মামদূহ, মিসর কৃত وصول التهاني بإثبات سنية السبحة والرد على الألباني
8.মাহমূদ সাঈদ মামদূহ, মিসর কৃত تنبيه المسلم إلى تعد الألباني على صحيح مسلم
9.মাহমূদ সাঈদ মামদূহ কৃত التعريف بأوهام من قسم السنن إلى صحيح وضعيف (১৪২১ হিজরী পর্যন্ত কিতাবটির ৬ খণ্ড প্রকাশিত হয়েছে যাতে ‘সুনানে আরবাআ’র কিতাবুল মানাসেক পর্যন্ত ওই সব হাদীসের উল্লেখ আছে শায়খ আলবানী রহ. যেসব হাদীসের ব্যাপারে উসূলে হাদীস এবং জারহ্‌-তাদীলের নীতিমালার ভূল ব্যবহার করে ভূল সিদ্ধান্ত প্রদান করেছেন। উল্লেখিত হাদীসের সংখ্যা ১৯০টি। এ ধারায় যদি কিতাবটি অগ্রসর হয় তবে সম্ভবত তা বিশ খণ্ডে সমাপ্ত হবে।)
10.শায়খ আব্দুল ফাত্তাহ আবু গুদ্দাহ রহ. কৃত خطبة الحاجة ليست سنة في مسهل التأ ليف والكتب كما قاله الشيخ الألباني সাবেক প্রফেসর, কুল্লিয়াতুশ শরীয়া, জামি’আ মালিক সাউদ, কুল্লিয়াতু উসূলিদ্দীন, জামি’আ মুহাম্মাদ বিন সউদ আলইসলামিয়া।
আপাতত এই দশটি কিতাবের নাম উল্লেখ করা হল। শায়খ আলবানীর রচনাবলির সমালোচনা ও পর্যালোচনায় লিখিত কিতাবের ফিরিস্তি অনেক দীর্ঘ। যে ভাইয়েরা সাধারণ বাংলা ভাষাভাষী পাঠকদের জন্য আলবানী রহ.এর ‘সিফাতুস সলাত’, ‘সিলসিলাতুয্‌ যয়ীফা’এর বাংলা অনুবাদ করেছেন, তাদের ব্যাপারে কি আমরা এই আশা করতে পারি যে, তারা উপরোক্ত কিতাবসমূহেরও বাংলা অনুবাদ পাঠকদের সামনে পেশ করবেন? বরং এসব কিতাবের উপর যদি কোন গবেষক দলীল ভিত্তিক মার্জিত কোন কিছু লিখে থাকেন তবে তাও বাংলায় অনুবাদ করে দিতে পারেন। এতে আমাদের পক্ষ থেকে কোন বাধা নেই। যেসব বিষয়ে একাধিক মত রয়েছে তার গবেষণা ও সিদ্ধান্তের জন্য যদি সাধারণ জনগণের সামনে তথ্যাবলীই পেশ করতে হয় তবে একতরফা না হয়ে উভয় পক্ষের তথ্যাবলীই পেশ করা উচিত। অন্যথায় তা ‘তাকলীদে শখ্‌সী’ বা ব্যক্তি তাকলীদই হয়ে যাচ্ছে। অথচ আমাদের ওই সব বন্ধুবর্গ বিষয়টির বিপক্ষে এতটাই সোচ্চার যে, এমনকি শরীয়তসম্মত পন্থায়ও তা অবলম্বন করতে নারাজ।
প্রশ্নের উত্তরঃ
১. সাধারণ আরবী জানা পাঠকের জন্য এই কিতাব কক্ষনো উপকারী নয়।
সিলসিলাতুল আহাদীসিয যয়ীফাতি ওয়াল মাওযূআ’-এ যেহেতু তথ্য ও উদ্ধৃতি প্রচুর পরিমাণে রয়েছে, তাই এই কিতাবটি ওই সব গবেষকদের জন্য উপকারী যারা সচেতন, সতর্ক এবং আল্লাহ্‌ চাহেতো কিতাবের ইলমী ও শাস্ত্রীয় ভ্রান্তিসমূহে নিপতিত হওয়ার আশঙ্কা মুক্ত। কিন্তু সাধারণ আরবী জানা পাঠকের জন্য যিনি শাস্ত্রজ্ঞ নন বা যার জ্ঞান পরিধির সীমা এই যে, তাকে কিতাবটি বাংলা অনুবাদের সাহায্যে পড়তে ও বুঝতে হয় তার জন্য এই কিতাব কক্ষনো উপকারী নয়। এ ধরণের ব্যক্তি কিতাবটি পড়ে আলবানী সাহেবের অন্ধ তাকলীদে নিপতিত হওয়ার বরং বহু ভুল ধারণার শিকার হওয়ার সমূহ আশঙ্কা রয়েছে। তারা অনেক সহীহ, হাসান হাদীসকে যয়ীফ মনে করবেন। যে হাদীসটি মওযূ নয় তাকে মওযূ ভেবে বসবেন। ‘সহীহ মুখতালাফ ফী’ অর্থাৎ যে হাদীস সহীহ হওয়ার ব্যাপারে ইমামগণের মতানৈক্য আছে রয়েছে এর প্রকারভুক্ত অনেক হাদীসের ব্যাপারে আলবানী সাহেবের মতামতকেই চূড়ান্ত মনে করবেন এবং পূর্ববর্তী হাদীস ও ফিক্‌হের ইমামগণের ব্যাপারে এই ভ্রান্ত ধারণায় পতিত হবেন যে, তাঁরা সহীহ হাদীস পরিত্যাগ করে যয়ীফ হাদীস দ্বারা প্রমাণ গ্রহণ করতেন। পাশাপাশি শায়খ আলবানী রহ.এর ভ্রান্তি ও ‘শায’ মতসমূহ দ্বারা প্রাভাবিত হয়ে ভয়ানক নিন্দনীয় তাকলীদের শিকার হবেন।
২. কিতাবটির বাংলা অনুবাদের মান...
এতো গেল মূল কিতাবের অবস্থা, এবার বাংলা অনুবাদটির কথায় আসা যাক।
অত্যন্ত দুঃখনীয় ব্যাপার হল, কিতাবটির বাংলা অনুবাদের অবস্থা অতি শোচনীয়। শুধু বাস্তব অবস্থাটি জানানোর খাতিরে পাঠকবৃন্দের কাছে ক্ষমা চেয়ে নিয়ে বলছি যে, অনুবাদক সাহেব আরবী ভাষাই ভালো জানেন না, শাস্ত্রীয় প্রাজ্ঞতা তো অনেক দূরের কথা। কিতাবটিতে যেসব ব্যক্তিবর্গের নাম বা কিতাবের নাম এসেছে তা-ও শুদ্ধভাবে উচ্চারণ করা তার পক্ষে সম্ভব হয়নি। আরবী উপস্থাপনাকে বাংলা ভাষায় ভাষান্তরের যোগ্যতা একদমই নেই। এ অবস্থায় কিতাবটির অনুবাদের দশা যে কী হবে এবং পাঠকরা এ থেকে কতটুকু শুদ্ধতা গ্রহণ করবেন তা আর বলার অপেক্ষা রাখে না।
যদি এখানে অনুবাদের শুধু হাস্যকর ভ্রান্তিসমূহের ফিরিস্তি দেয়া হয় তাহলে তা একটি স্বতন্ত্র কিতাবের রূপ পরিগ্রহ করবে। নমুনাস্বরূপ কিছু উল্লেখ করা হল:
৬২ থেকে ৮০ পৃষ্ঠার মধ্যেই এতগুলো ভুল, তাও শুধু নামের উচ্চারণ সংশ্লিষ্ট। কিতাবের এই খণ্ডটি থেকে যদি শুধু উচ্চারণের ভুলই সংকলন করা হয়, তাহলেও একটি পুস্তিকা হয়ে যাবে।
উলূমুল হাদীসের শাস্ত্রীয় পরিভাষাসমূহের অনুবাদের ব্যাপারে অনুবাদকের জ্ঞান ও ধারণা যে কীরূপ তা তার পরিভাষাসমূহের আভিধানিক অনুবাদ প্রচেষ্টা থেকেই স্পষ্ট হয়ে যায়ঃ ১. الجرح المبين مقدم علي التعديل এর অনুবাদ করেছেন, “ব্যাখ্যাকৃত দোষারোপ অগ্রাধিকার পাবে নির্দোষিতার উপর।” (পৃ. ৭১, হাদীস নং. ১৪)
অথচ এটি একটি শাস্ত্রীয় মূলনীতি। এর মর্ম হল, কোন রাবীর ব্যাপারে যদি ইমামগণের মতভেদ থাকে এবং এক ইমাম তাকে ‘বিশ্বস্ত’ বলেন আর অপর ইমাম ‘অগ্রহণযোগ্য’ বলে মত প্রকাশ করেন এবং তার এই মতপ্রকাশের উপযুক্ত কারণও দর্শান, তাহলে (শর্তসাপেক্ষে) শেষোক্ত ইমামের মতটিই প্রাধান্য পায়।
বলাবাহুল্য, আমাদের অনুবাদক বাক্যটির যে অনুবাদ করেছেন তা থেকে এই মর্ম-উদ্ধার কারো পক্ষেই করা সম্ভব নয়। তাছাড়া جرح শব্দের অনুবাদ ‘দোষারোপ’ আর تعديل শব্দের অনুবাদ ‘নির্দোষিতা’ এমনকি আভিধানিক দিক দিয়েও শুদ্ধ নয়।
২. فالحمل في الحديث علي البشكريأولي এর অনুবাদে লিখেছেন, “তার দোষ বর্ণনা করাই উত্তম।” (পৃ. ৭৩, হাদীস ১৭)
এই পারিভাষিক শব্দটির অর্থ হল, “এই বর্ণনার ব্যাপারে ইয়াশকুরিকে অভিযুক্ত করাই অধিক সমিচীন।” পরিভাষার অনুবাদ যদি অভিধান দিয়ে করার চেষ্টা করা হয় তাহলে এ ধরণের দুর্বোধ্য বাক্যই জন্মলাভ করবে বৈ কি!
৩. تصحيح الترمذي এর অর্থ করেছেন, “ইমাম তিরমিযীর বিশুদ্ধকরণের।” (পৃ. ৮০, হাদীস নং. ২৪)
বলাবাহুল্য, এটা পানি বিশুদ্ধকরণের মত কোন ব্যাপার নয়। এখানে আরবী تصحيح শব্দটি পারিভাষিক অর্থেই ব্যবহৃত হয়েছে। এর অর্থ হল, ‘বর্ণনার ব্যাপারে ‘সহীহ’ হওয়ার সিদ্ধান্ত দেয়া’। আর এটাও তো অতি সহজ কথা যে, কোন বিবরণকে বাস্তব বা অবাস্তব ‘বানানো’ যায় না, বাস্তব বা অবাস্তব হওয়ার ঘোষণা দেয়া যায় মাত্র।
৪. بخطئ علي الثقات এর অনুবাদ লিখেছেন, “তিনি নির্ভরশীলদের বিপক্ষে ভুল করতেন। (পৃ. ৭৯, হাদীস ২৪)
‘নির্ভরশীল’দের পক্ষে ভুল করাও কি গ্রহণযোগ্য? আসলে তিনি যা করতেন তা হল, ‘নির্ভরযোগ্য রাবীদের থেকে বর্ণনা করার সময় ভুল করতেন।’ এই মন্তব্যে বোঝানো হচ্ছে যে, ভুলটি আসলে তারই হত, যিনি তাকে হাদীস শুনিয়েছেন তার নয়। কেননা তিনি তো নির্ভরযোগ্য।
ছোট আরেকটি কথা, ثقة শব্দটির অর্থ কিন্তু ‘নির্ভরশীল’ নয়, ‘নির্ভরযোগ্য’। তাঁরা নির্ভরযোগ্য, আর আমরা তাদের প্রতি ‘নির্ভরশীল’। অনুবাদের অসংখ্য স্থানে ‘নির্ভরযোগ্য’ ব্যক্তিদেরকে ‘নির্ভরশীল’ বানিয়ে দেয়া হয়েছে!
৫. وعمر هذا عامة أهاديثه لا يتابعه الثقات عليه এর তরজমা করেছেন, “নির্ভরশীল বর্ণনাকারী গণ এই উমারের হাদীসগুলোর অনুসরণ করেননি। (পৃ. ১০৪)
‘অনুসরণ’ শব্দটিই এখানে অপ্রাসঙ্গিক। কেননা বিষয়টি হাদীস অনুসরণের নয় মোটেও। ‘হাদীস-যাচাই’ পর্ব এবং এ পর্বে উত্তীর্ণ হাদীসগুলোর ক্ষেত্রে আসবে ‘হাদীস-অনুসরণ’এর পর্ব। আমাদের আলোচ্য বাক্যটির প্রথম পর্বের সাথে সংশ্লিষ্ট। দ্বিতীয় পর্বের সাথে নয়। বাক্যটিতে বলা হয়েছে, ‘উমারের অধিকাংশ বর্ণনাই এমন যার সমর্থনে অন্যান্য নির্ভরযোগ্য রাবীদের কোন বর্ণনা পাওয়া যায় না।’
বোঝানো হচ্ছে, রাবীটির অধিকাংশ বর্ণনাই শাস্ত্রীয় বিচারে ‘শায’ বা ‘মুনকার’। সুতরাং রাবী হিসেবে তিনি অগ্রহণযোগ্য।
লক্ষ করুন, এখানেও কিন্তু শব্দটি ‘নির্ভরশীল’!
৭৬ পৃষ্ঠায় جاه বাক্যটির অর্থ করেছেন, “সত্তা”; অথচ এর অর্থ হল “পদমর্যাদা”।
৭৭ পৃষ্ঠায় لقنها حذتها বাক্যটির অনুবাদ করেছেন, “তাকে উপাধি দাও তার অলংকার হিসেবে।” অর্থ হবে “তাকে তার দলীল শিখিয়ে দাও।”
৮৭ পৃষ্ঠায় بحق السائلين عليك বাক্যটির অনুবাদ করেছেন, “তোমার নিকট প্রার্থনাকারীদের সত্য জানার দ্বারা।” সঠিক অর্থ হল, “তোমার কাছ থেকে প্রার্থনাকারীদের যে দাবি রয়েছে, তার ভিত্তিতে...” দানশীল প্রভুর দানশীলতাই প্রার্থনাকারীর দাবি প্রতিষ্ঠা করে। ‘সত্য জানা’ শব্দটি এখানে অপ্রাসঙ্গিক।
৪৬৫ নং হাদীসের إن لغة إسماعيل كانت قد এর অনুবাদ করেছেন, “ইসমাঈলের ভাষা শিক্ষা গ্রহণ করেছিল?” অথচ এর অর্থ হল, “ইসমাঈলের ভাষা বিলুপ্ত হয়ে গিয়েছিল।”
আরবী ইবারত বোঝার এবং রাবী ও মনীষীদের জন্ম-মৃত্যু-সন-তারিখ জানার ব্যাপারে অনুবাদকের অবস্থা যে কীরূপ অবর্ণনীয় তা নিম্নোক্ত দৃষ্টান্ত থেকেই স্পষ্ট হয়। কিতাবটির ভূমিকায় ইমাম নবভী রহ.এর বক্তব্য- قال العلماء من المحدثين والفقهاء بحوز ويستحب العلمل بالضعيف في قفاتل الأعمال এর অনুবাদ করেছেন, “মুহাদ্দিস এবং ফকীহগণের মধ্যে কতিপয় আলেম বলেন, ফযীলতের ক্ষেত্রে দুর্বল হাদীসের উপর আমল করা জায়েয এবং মুস্তাহাব...।” অথচ বিশুদ্ধ অনুবাদ হবে, “সকল মুহাদ্দিস ও ফকীহ আলেম বলেছেন, ‘ফযীলতের ক্ষেত্রে দুর্বল হাদীসের উপর আমল করা জায়েয এবং মুস্তাহাব...।’”
অনুবাদকের কৃত অনুবাদটি তখনই শুদ্ধ হত যদি আরবী বাক্যটি এরূপ হত قال طائقة من العلماء বা قال العلماء
৫১-৫২ পৃষ্ঠায় তো এমন জগাখিচুড়ি পাকিয়েছেন যে, ইবন্‌ হুমামের (জন্ম ৭৯০হি.-মৃত্যু ৮৬১হি.) ব্যাপারে বলেছেন, তিনি নাকি জালালুদ্দীন দাওওয়ানীর (জন্ম ৮৩০হি.-মৃত্যু ৯১৮হি.) বরাতে অমুক কথাটি উল্লেখ করেছেন...। এ বলে অনুবাদক ইবনুল হুমামের উপর আপত্তি উত্থাপন শুদ্ধ করেছেন। অথচ এসব কিছুর মূলে হল আলবানী সাহেবের বক্তব্য না বোঝা। সেখানে ইবনুল হুমামের বক্তব্য ভিন্ন এবং জালালুদ্দীন দাওওয়ানীর বক্তব্য ভিন্ন। ইবনুল হুমাম জালালুদ্দীন দাওওয়ানী থেকে কিছুই উদ্ধৃত করেননি। কিন্তু আরবী ভাষায় আলোচনার শুরু ও শেষ ধরতে না পারায় তিনি উপরোক্ত বিভ্রান্তিতে পতিত করেছেন। ৫৩ পৃষ্ঠায় সূরা নাহলের ৪৩ ও ৪৪ নং আয়াত فَاسْأَلُوا أَهْلَ الذِّكْرِ إِن كُنتُمْ لَا تَعْلَمُونَ এর অনুবাদ করেছেন, “তোমরা না জানলে জ্ঞানীদেরকে প্রশ্ন করে দলীল সহকারে জেনে নাও।”
অথচ بِالْبَيِّنَاتِ وَالزُّبُرِ বাক্যাংশটি ৪৩ নং আয়াতের সূচনা وَمَا أَرْسَلْنَا مِن قَبْلِكَ إِلَّا رِجَالًا نُّوحِي إِلَيْهِمْ সংযুক্ত। আয়াত দুটির সঠিক অর্থ হচ্ছে-“আমি আপনার পূর্বে পুরুষদেরকেই রসূলরূপে প্রেরণ করেছি এবং তাঁদের নিকট প্রত্যাদেশ পাঠিয়েছি। সুতরাং তোমরা যদি না জান তবে জ্ঞানীদেরকে জিজ্ঞাসা কর। তাঁদেরকে প্রেরণ করেছি নিদর্শনাবলি ও (অবতীর্ণ) গ্রন্থ সহ এবং আপনার প্রতি কুর’আন অবতীর্ণ করেছি, যাতে মানুষকে সুস্পষ্টভাবে বুঝিয়ে দিতে পারেন, যা তাদের প্রতি অবতীর্ণ করা হয়েছে এবং তারা যাতে চিন্তা-ভাবনা করতে পারে।”
চিন্তার ব্যাপার হল এই যে, যিনি কুর’আনুল কারীমের আয়াতের অনুবাদের ক্ষেত্রে এ ধরণের দায়িত্বজ্ঞানহীনতার পরিচয় দেন, তিনি সাধারণ কোন কিতাবের অনুবাদের ব্যাপারে কী দায়িত্বের পরিচয় দিবেন?
আয়াতের অনুবাদের ভ্রান্তির কারণে আয়াতের যে ‘তাহ্‌রীফ’ ও বিকৃতি তিনি করেছেন তা তো আপন স্থানে আছেই; এ ছাড়া তিনি যেন এই ভুল তরজমার ভিত্তিতে প্রমাণ করতে চান যে, কোন সাধারণ মানুষ আলেমগণের নিকট মাসাআলা জিজ্ঞাসা করলে তার দলীলও জিজ্ঞাসা করে নিবে। দলীলের উল্লেখ ছাড়া কোন আলেমের মাসাআলা গ্রহণ করবেন না!!! নাউযুবিল্লাহ্‌।
সাধারণ মানুষ যদি দলীল বোঝার যোগ্যই হত তবে তো আর আলেমকে জিজ্ঞাসা করার প্রয়োজন ছিল না। এও কি সম্ভব যে, কুর’আনুল কারীম সাধারণ মানুষকেও দলীল-প্রমাণ এবং এ সংক্রান্ত হাজারো শাস্ত্রীয় জটিলতা সমেত মাসাআলা জানতে বাধ্য করবে?
আকমাল সাহেবের অনুবাদটির আরেকটি বড় ত্রুটি এই যে, তিনি অনুবাদের বহু স্থানে মূল কিতাবের বহু বাক্য, কোথাও এক বা একাধিক প্যারা, আবার কোথাও একাধিক পৃষ্ঠার আলোচনা একদম উড়িয়ে দিয়েছেন; যার অনুবাদের ধারে কাছেও তিনি যাননি। তার এই নীতির (?) কথা না তিনি তার মুখবন্ধে উল্লেখ করেছেন, না সংশ্লিষ্ট স্থানসমূহে এ ব্যাপারে কোন নোট দিয়েছেন। এ আচরণ যে বস্তুনিষ্ঠ অনুবাদের নীতি বিরোধী, তা তো বলাই বাহুল্য।
সকল ভুল এক পর্যায়ের নয়। উপরোক্ত ভ্রান্তিগুলো এমন যে, এর যে কোন প্রকারের দুএকটি ভুলও পুরো অনুবাদের ব্যাপারে আস্থা বিনষ্ট করে দেয়।
আমার বুঝে আসে না, শায়খ আকরামুজ্জামান, এর কী সম্পাদনা করেছেন এবং ড. আসাদুল্লাহিল গালিব এই অনুবাদের ব্যাপারে প্রশংসাসূচক মতামত কীভাবে দিয়ে দিলেন?
(৩)........
সাধারণ পাঠকদের জন্য এ কিতাবে আরো যে বিষয়টি বিভ্রান্তিকর তা হল, কিতাবটিতে অনেক হাদীস এমন আছে যার সনদসমূহ যদিও সহীহ নয়, কিন্তু উক্ত বিষয়েই অন্য হাদীস রয়েছে যা সহীহ অথবা সেই সব হাদীসে যে বিষয়টি উল্লেখিত হয়েছে তা অন্য কোন শরয়ী দলীল দ্বারা প্রমাণিত অথবা কথাটি যদিও হাদীস হিসেবে প্রমাণিত নয়, কিন্তু তা একটি উপদেশমূলক কথা, মানুষের চিন্তা ও কর্মে যার ভাল প্রভাব রয়েছে। এ জাতীয় হাদীসের দুর্বলতা বর্ণনা করার সময় বা হাদীস হিসেবে তা অপ্রমাণিত হলে এর প্রকৃত অবস্থা বর্ণনা করার সময় অন্তত সাধারণ মানুষের জন্য লিখিত বইপত্রে এ ব্যাপারে সচেতন হওয়া উচিত যে, শাস্ত্রীয় বিচারে হাদীসটির মান বর্ণনা করার পাশাপাশি এর মূল বিষয়বস্তুর ব্যাপারে স্পষ্ট করে দেয়া উচিত যে, তার শরয়ী বা দালীলিক মান কী? যাতে হাদীসটির শাস্ত্রীয় আলোচনার দরুন সাধারণ পাঠকের মনে মূল বিষয়ের ব্যাপারে কোন ভুল ধারণা সৃষ্টি না হয়।
এ কাজটি না আলবানী রহ. করেছেন, তা তাঁর অনুবাদক টীকা-টিপ্পনীর মাধ্যমে তা আঞ্জাম দিয়েছেন। এটি এ কিতাবের (যদি তা জনসাধারণের সামনে পেশ করতে হয়) অনেক বড় ত্রুটি। এ প্রসঙ্গে একটি দৃষ্টান্তঃ
শায়খ আলবানী রহ. حدتএর ব্যাপারে কিছু হাদীস উল্লেখ করে বলেছেন, এ ব্যাপারে যত হাদীস আছে একটি (২৬নং) ছাড়া সব মওযূ।
আমাদের অনুবাদক حدت এর অনুবাদ করেছেন ‘ধর্মীয় চেতনা’। (বলাবাহুল্য, حدت এর অনুবাদ ‘ধর্মীয় চেতনা’ করা ভুল।)
এরপর লিখেছেন, ধর্মীয় চেতনার ব্যাপারে যত হাদীস আছে সব মওযূ একটি হাদীস ছাড়া তাও যয়ীফ।
একে তো এ কথাটাই বাস্তবসম্মত নয়; কেননা বেশ কিছু আয়াত ও সহীহ হাদীস থেকে ধর্মীয় চেতনার গুরুত্ব বুঝে আসে। যদি এসব আয়াত ও হাদীস নাও থাকত তবুও শরীয়তের উসূল ও কাওয়ায়েদের আলোকে এবং ‘আকলে সালীম’ (সুস্থ বিবেক)এর আলোকেই তা একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হিসেবে প্রমাণিত হত।
এ অবস্থায় ধর্মীয় চেতনার গুরুত্ব বর্ণনা না করে এমনই বলে দেওয়া যে, ধর্মীয় চেতনার ব্যাপারে যত হাদীস আছে সব মওযূ শুধু একটি হাদীস ছাড়া... কী ধরণের বিভ্রান্তি সৃষ্টি করতে পারে? একজন সাধারণ মুসলমান এ বক্তব্যটি পড়ে এই সংশয়ে নিপতিত হবে যে, ধর্মীয় চেতনা এমন কি খারাপ জিনিস যে এ ব্যাপারে যত হাদীস আছে সবই মওযূ।
(৪).
কারো ইলমী মাকাম নির্ধারণের ব্যাপারে সংশ্লিষ্ট শাস্ত্রের লোক নন এমন ব্যক্তির সাক্ষ্য কোনভাবেই গ্রহণযোগ্য নয়।
শায়খ নাসিরুদ্দীন আলবানী রহ.এর ব্যাপারে আপনি দেলাওয়ার হোসেন সাঈদী সাহেবের যে বক্তব্য উদ্ধৃত করেছেন, এ জাতীয় বক্তব্য গ্রহণযোগ্য হওয়ার জন্য তা কোন শাস্ত্রজ্ঞ মুহাদ্দিসের হওয়া জরুরী ছিল।
কারো ইলমী মাকাম নির্ধারণের ব্যাপারে সংশ্লিষ্ট শাস্ত্রের লোক নন এমন ব্যক্তির সাক্ষ্য কোনভাবেই গ্রহণযোগ্য নয়।
শায়খ আলবানী রহ.এর ব্যাপারে কোন শাস্ত্রজ্ঞ ন্যায়নিষ্ঠ ব্যক্তি থেকে এ জাতীয় কোন সনদের কথা আমাদের জানা নেই। এ কথা সত্য যে, তিনি জামিয়া ইসলামিয়া মদীনা মুনাওয়ারায় কয়েক বছর শিক্ষকতা করেছেন। কিন্তু তাঁর নতুন নতুন মতামত উদ্ভাবনের ফলে তৎকালীন সৌদির ধর্মীয় নেতা শায়খ মুহাম্মাদ বিন ইব্রাহীম তাঁকে অব্যাহতি প্রদান করেন এবং তাঁকে জামিয়া ইসলামিয়ায় অবস্থানের সুযোগ বন্ধ করে দেন। এরপর তিনি দামেস্কে অবস্থান করে তাঁর রচনাকর্ম অব্যাহত রাখেন। পরবর্তী সময়ে তিনি ওখানেই অবস্থান গ্রহণ করেন এবং ২২ জুমাদাল উলা ১৪২০ হিজরীতে মৃত্যুবরণ করেন।
আল্লাহ তা’আলা তাঁকে ক্ষমা করুন; তাঁর ভাল অবদানসমূহ দ্বারা উম্মতকে উপকৃত করুন; তাঁর রচনাবলির মন্দ প্রভাব থেকে সকলকে মাহফুয রাখুন এবং তাঁকে জান্নাতুল ফেরদাউসে স্থান দান করুন। আমীন ইয়া রব্বাল আলামীন!

Thursday, March 16, 2017

ওমরা


ওমরা অর্থ প্রতিষ্ঠিত গৃহের যিয়ারত করা এবং শরীয়াতের পরিভাষায় ওমরার অর্থ ছোট হজ্জ যা সবসময়ে হতে পারে। তার জন্যে কোনো মাস ও দিন নির্ধারিত নেই। যখনই মন চাইবে ইহরাম বেধে  বায়তুল্লাহর তাওয়াফ করে, সায়ী করবে এবং মস্তক মুণ্ডন বা চুল ছেঁটে ইহরাম খুলবে। ওমরা হজ্জের সাথেও করা যায় এবং আলাদাও করা যায়। কুরআন বলে-
*******আরবী*********
এবং আল্লাহর সন্তুষ্টির জন্যে হজ্জ ও ওমরা করি। (সূরা আল বাকারা)
হাদিসে ওমরার বিরাট ফযিলত বয়ান করা হয়েছে। নবী (স) বলেন, সবচেয়ে উৎকৃষ্ট আমল ঈমানের সাক্ষ্যদান। তারপর হিজরত ও জিহাদের মর্যাদা। তারপর দুটো আমলের চেয়ে উৎকৃষ্ট আমল আর কিছু নেই। একটি হজ্জে মাবরুর এবং দ্বিতীয়টি ওমরাহ মাবরুর। (মুসনাদে আহমদ)
ওমরাহ মাবরুর অর্থ এমন ওমরাহ যা নিছক আল্লাহর সন্তুষ্টির জন্যে তার সকল নিয়ম নীতি ও শর্তগুলোসহ পালন করা হয়।
নবী (স) আরও বলেন, যে ব্যক্তি হজ্জ অথবা ওমরার নিয়তে বাড়ী থেকে রওয়ানা হলো এবং তারপর সে পথেই মৃত্যুবরণ করলো, সে বিনা হিসেবে বেহেশতে যাবে। আল্লাহ তায়ালা বায়তুল্লাহ যিয়ারতকারীদের জন্যে গর্ববোধ করেন। (বায়হাকী, দারুকুতনী)
নবী (স) বলেন, হজ্জ ও ওমরাহকারী আল্লাহর মেহমান। তারা আল্লাহর দাওয়াতে আসে। অতএব, তারা যা কিছু তার কাছে চায়, তা পায়। (আল বাযযার)
এক ওমরাহ দ্বিতীয় ওমরাহ পর্যন্ত গুনাহগুলোর কাফফারা হয়ে যায়। (বুখারী, মুসলিম)
ওমরার মাসায়েল
১. জীবনে একবার ওমরা করা সুন্নাতে মুয়াক্কাদা। তাছাড়া তা যখনই করা হোক, তার জন্যে প্রতিদান ও বরকত রয়েছে। হযরত জাবের (রা) বলেন, নবী (স) কে জিজ্ঞেস করা হয়েছিল- ওমরাহ কি ওয়াজিব? নবী (স) বলেন- না, তবে ওমরা করো, এর বড়ো ফযিলত রয়েছে।
২. ওমরার জন্যে কোনো মাস, দিন ও সময় নির্ধারিত নেই যেমন হজ্জের জন্যে রয়েছে। যখনই সুযোগ হবে ওমরাহ করা যেতে পারে।
৩. রমযানে ওমরাহ করা মুস্তাহাব। নবী (স) বলেন, রমযানে ওমরা করা এমন যেন আমার সাথে হজ্জ করা। (আবু দাউদ) বুখারীতে আছে, রমযানে ওমরা হজ্জের সমান।
৪. ওমরার জন্যে মীকাত হচ্ছে হিল এবং সকলের জন্যেই তাই, চাই তারা আফাকী হোক অথবা মীকাতের ভেতরের হোক অথবা মক্কার অধিবাসী হোক। হজ্জের মীকাত মক্কাবাসীদের জন্যে হিল।
৫. ওমরার আমল শুধু ইহরাম বাধা, তাওয়াফ করা, সায়ী করা এবং মাথা মুণ্ডন করা অথবা চুল ছোট করা।

Saturday, February 25, 2017

রোজার ফরয


রোজার মধ্যে সুবহে সাদেক হতে সূর্যাস্ত পর্যন্ত তিনটি বিষয় থেকে বিরত থাকা ফরজ।
১. কিছু খাওয়া থেকে বিরত থাকা।
২. কিছু পান করা থেকে বিরত থাকা।
৩. যৌন বাসনা পূর্ণ করা থেকে বিরত থাকা।
যৌনবাসনা পূরণের মধ্যে ঐসব যৌন সম্ভোগ শামিল যার দ্বারা বীর্যপাত হয়, তা স্ত্রী সংগমের দ্বারা হোক বা যে কোন মানুষ, পশু প্রভৃতির সাথে যৌন ক্রিয়ার দ্বারা হোক। অথবা হস্তমৈথুনের দ্বারা হোক। মোটকথা এসব থেকে বিরত থাকতে হবে। অবশ্যি আপন স্ত্রীকে দেখা আদর করা, জড়িয়ে ধরা অথবা চুমু থেকে বিরত থাকা ফরজ নয়। কারণ তাতে বীর্যপাত হয় না।
রোযার সুন্নাত ও মোস্তাহাব
১. সিহরীর ব্যবস্থা করা সুন্নাত, কয়েকটি খেজুর হোক বা এক চুমুক পানি হোক।
২. সিহরীর সময় খাওয়া মোস্তাহাব।সুবহে সাদিক হতে যখন সামান্য বাকি।
৩. রোজার নিয়ত রাতেই করে নেওয়া মোস্তাহাব।
৪. ইফতার তাড়াতাড়ি করা মোস্তাহাব। অর্থাৎ সূর্য অস্ত যাওয়ার পর অথবা বিলম্ব না করা।
৫. খুরমা খেজুর অথবা পানি দিয়ে ইফতার করা মোস্তাহাব।
৬. গীবত, চোগলখুরী, মিথ্যা বল, রাগ এবং বাড়াবাড়ি না করা সুন্নাত। এ কাজ অবশ্যি অন্য সময় করাও ঠিক নয়। কিন্তু রোজার সময় তার থেকে দূরে থাকার চেষ্টা বেশী করে করা উচিৎ।
কি কি কারণে রোজা নষ্ট হয়
রোযা অবস্থায় তিনটি বিষয় থেকে দূরে থাকা ফরয, যথাঃ
(১) কিছু না খাওয়া (২) কিছু পান না করা এবং (৩) যৌনবাসনা পূর্ণ না করা। এসব থেকে বিরত থাকা ফরয।
অতএব উপরোক্ত তিনটি ফরযের খেলাপ কাজ করলেই রোযা নষ্ট হয়। যেসব জিনিস রোযা নষ্ট করে তা আবার দু প্রকার। এক – যার দ্বারা শুধু কাযা ওয়াজিব হয়। দুই-যার দ্বারা কাযা ও কাফফারা উভয়ই ওয়াজিব হয়।
কাফফারা ওয়াজিব হওয়া সম্পর্কে কিছু নীতিগত কথা
১. কোনো কিছু ইচ্ছা করে পেটে প্রবেশ করালে এবং তা উপকারী হওয়ার ধারণাও যদি থাকে, তা খাদ্য হোক, ঔষধ হোক অথবা এমন কাজ হোক যার আস্বাদ সংগম ক্রিয়ার মতো, তাহলে এসব অবস্থায় কাযা এবং কাফফারা দুই ওয়াজিব হয়।
২. কোনো কিছু যদি আপনা আপনি পেটের মধ্যে চলে যায়, তার উপকারী হওয়ার ধারনাও না থাকে, অথবা এমন কোনো কাজ করা হলো যার আস্বাদ সংগম ক্রিয়ার মতো নয়, তাহলে শুধু মাত্রা কাযা ওয়াজিব হবে।
৩. শুধু রমযানের রোযা নষ্ট হলেই তার কাফফারা ওয়াজিব হয়, রমযান ছাড়া অন্য রোযা নষ্ট হলে তার কাফফারা ওয়াজিব হবে না, তা ভুলক্রমে নষ্ট হোক অথবা ইচ্ছা করে নষ্ট করা হোক।
৪. রমযানের কাযা রোযা নষ্ট হলে তার কাফফারা ওয়াজিব হবে না, শুধু রমাযান মাসে রোযা নষ্ট হলে কাফফারা ওয়াজিব হবে।
৫. যাদের মধ্যে রোযা ওয়াজিব হওয়ার শর্ত পাওয়া যায় না, তাদের রোযা নষ্ট হলেও কাফফারা ওয়াজিব হবে না। যেমন, মুসাফিরের রোযা, হায়েয নেসাফ ওয়ালী মেয়েদের রোযা। যদিও মুসাফির এবং হায়েয নেফাস ওয়ালী মেয়েলোক রোযার নিয়ত সফর শুরু করার আগে এবং হায়েয নিফাস হওয়ার আগে করে থাকে।
৬. যে কোনো কাজ যদি অনিচ্ছাকৃতভাবে হয়ে যায়, যেমন ভুল করে কেউ কিছু খেয়ে নিলো, অথবা যৌন ক্রিয়া করলো, অথবা কুল্লি করতে হঠাৎ পানি গলার ভেতর চরে গেল, অথবা কেউ জবরদস্তি করে যৌন ক্রিয়া করালো তাহলে এসব অবস্থায় কাফফারা ওয়াজিব হবে না।
৭. যৌনক্রিয়ায় ক্রিয়াকারী এবং যার ওপর কারা হলো এ উভয়ের জ্ঞানসম্পন্ন হওয়া শর্ত নয়। উভয়ের মধ্যে যে জ্ঞানসম্পন্ন এবং স্বেচ্ছায় এ কাজ করবে তার কাফফারা ওয়াজিব হবে। নারী জ্ঞানসম্পন্ন হলে কাফফারা তাকে দিতে হবে পুরুষকে নয়। আবার পুরুষ জ্ঞানসম্পন্ন হলে তাকে কাফফারা দিতে হবে, মাথা খারাপ পাগল মেয়ে মানুষের ওপর কাফফারা ওয়াজিব হবে না।
৮. কোনো মেয়েলোক নাবালক ছেলে দ্বারা যৌন ক্রিয়া করে নিলে অথবা কোনো পাগলের দ্বারা, তার ওপর কাযা ও কাফফারা দুটিই ওয়াজিব হবে।
৯. রমযানে রোযার নিয়ত ব্যতিরেকে কেউ খানা-পিনা করলে তার ওপর কাফফারা ওয়াজিব হবে না, শুধু কাযা ওয়াজিব হবে। কাফফারা তখনই ওয়াজিব যদি রোযার নিয়ত করার পর তা নষ্ট করে।
১০. কোনো সন্দেহের কারণে কেউ রোযা নষ্ট করলে কাফফারা দিতে হবে না।

Friday, February 24, 2017

রোজার শর্তাবলী


রোজার শর্ত দুইপ্রকার:
  • রোজা সহীহ হওয়ার শর্ত।
  • রোজা ওয়াজিব হওয়ার শর্ত।
রোজা ওয়াজিব হওয়ার জন্য যেসব জিনিষের প্রয়োজন তাকে শারায়াতে সিহহাত বলে এবং হওয়ার জন্য যা প্রয়োজন তাকে শারায়াতে অযুব বলে।
রোজা ওয়াজিব হওয়ার শর্ত
১. ইসলাম।কাফেরের উপর রোজা ওয়াজিব নয়।
২. বালেগ হওয়া। নাবালেগের উপর রোজা ওয়াজিব নয়।
অবশ্যি অভ্যাস সৃষ্টি করার জন্য নাবালেগ ছেলেমেয়েদের উপর রোজা রাখতে বলা উচিৎ। যেমন নামাজ পড়বার অভ্যাস করবার তাগিদ হাদীসে করা হয়েছে। তেমনি রোজা রাখবার জন্যও প্রেরণা দেওয়া হয়েছে। যারা ক্ষুধা তৃষ্ণা সহ্য করতে পারে তাদেরকেই শুধু রোজা রাখতে বলা হয়েছে। এ ব্যাপারে বাড়াবাড়ি ভালো নয়।
৩. রমজানের রোজা ফরজ হওয়া সম্বন্ধে জানা থাকা।
৪. মাযুর বা অক্ষম না হওয়া। অর্থাৎ এমন কোন ওজর না থাকা যাতে রোজা না থাকার অনুমতি রয়েছে, সফর, বার্ধক্য, রোগ, জিহাদ, ইত্যাদি।
রোজা সহীহ হওয়ার শর্তাবলী
১. ইসলাম। কাফেরের রোজা সহীহ নয়।
২. মহিলাদের হায়েজ নেফাস থেকে পবিত্র হওয়া।
৩. নিয়ত করা। অর্থাৎ মনে মনে রোজা রাখার ইরাদা করা। রোজা রাখার ইরাদা ছাড়া কেউ সারাদিন যদি ঐসব জিনিস থেকে বিরত থাকে যার থেকে বিরত থাকতে বলা হয়েছে। তাহলে তার রোজা হবে না।
 

Thursday, February 23, 2017

রোযার ফযিলত

নবী (স) বলেন, প্রত্যেক নেক আমলে প্রতিদান দশ থেকে সাতশ গুণ পর্যন্ত বাড়ানো হয়। কিন্তু আল্লাহ এরশাদ হচ্ছে, রোযার ব্যাপারটাই অন্য রকম। তাতো আমার জন্য নির্দিষ্ট। আমি স্বয়ং তার প্রতিদান দেব। বান্দা আমার জন্যে তার যৌনবাসনা ও খানাপিনা বন্ধ রাখে। রোযাদারের জন্যে দুটি আনন্দ, একটা হচ্ছে ইফতারের সময় যখন সে এ আবেগ উল্লাসে উদ্বুদ্ধ হয়ে আল্লাহর নিয়ামত উপভোগ করতে থাকে যে, আল্লাহ তাকে একটা ফরয আদায় করার তাওফিক দান করেছেন।
দ্বিতীয় আনন্দ আপন পরওয়ারদেগারের সাথে মিলিত হওয়ায় যখন সে আল্লাহর দরবারে সাক্ষাতের অনুমতি লাভ করবে এবং দীদার লাভ করে চক্ষু শীতল করবে।
রোজাদারের মুখের গন্ধ আল্লাহর কাছে মিশকের সুগন্ধি থেকেও উৎকৃষ্টতর। রোযা গোনাহ থেকে আত্মরক্ষার ঢাল স্বরূপ। তোমাদের মধ্যে কেউ রোযা রাখলে সে যেন অশ্লীল কথাবার্তা ও হৈ হাংগামা থেকে দূরে থাকে। যদি কেউ গালিগালাজ করতে থাকে অথবা ঝগড়া করতে আসে, তাহলে তার মনে করা উচিত যে, সে রোযা আছে। (বুখারী, মুসলিম)
নবী (স) আরও বলেন, যে ঈমানের অনুভূতি এবং আখিরাতের সওয়াবের আশায় রোযা রাখে তা পূর্বের সব গোনাহ (সগীরা) মাপ করে দেয়া হয়। (বুখারী, মুসলিম)
রুইয়েতে হেলাল বা চাঁদ দেখার নির্দেশাবলী
১. শাবানের উনত্রিশ তারিখে রমযানের চাঁদ দেখার চেষ্টা করা মুসলমানদের ওয়াজিবে কেফায়া। (সামগ্রিকভাবে মুসলমানদের ওপর ওয়াজিব যে, রমযানের চাঁদ দেখার ব্যবস্থা তারা করবে। গোটা সমাজ যদি এর গুরুত্ব অনুভব না করে এবং বিষয়টিকে অবহেলা করে তাহলে সকলেই গোনাহগার হবে) পঞ্জিকা ইত্যাদির ওপর নির্ভর করে রোযা রাখা এবং চাঁদ দেখা থেকে বেপরোয়া হওয়া কিছুতেই জায়েয নয়। এমনকি যারা গণনা শাস্ত্রে বিশেষজ্ঞ এবং নেক ও পরহেজগার, তাদেরও নিজের হিসেবের ওপর আমল করা জায়েয নয়। নবী (স) বলেন, চাঁদ দেখা রোযা রাখ এবং চাঁদ দেখে রোযা খতম কর। যদি ২৯ শাবান চাঁদ দেখা না যায় তাহলে শাবানের ত্রিশ দিন পূর্ণ কর। (সহীহ বুখারী ও মুসলিম)
২. কোনো অভিজ্ঞতার ভিত্তিতে চাঁদ দেখা মেনে নেয়া এবং তদনুযায়ী রোযা রাখা জায়েয নয়। যেমন একটা প্রবাদ আছে যেদিনটি রজব মাসের ৪ঠা সে দিনটি রমযানের পয়লা এবং বারবার এটা পরীক্ষা করা হয়েছে।
৩. রজবের উনত্রিশ তারিখে চাঁদ দেখার চেষ্টা ও ব্যবস্থা করা মোস্তাহাব। কারণ রমযানের পয়লা তারিখ জানার জন্যে শাবানের তারিখগুলো জানা জরুরী। যেমন মনে করুন উনত্রিশ রজব চাঁদ উদয় হলো। কিন্তু লোকে তা দেখার কোনো ব্যবস্থা করেনি। তারপর ১লা শাবানকে ৩০শে রজব মনে করে হিসেব করতে থাকলো। এভাবে ৩০শে শাবান এসে গেল। কিন্তু আকাশে মেঘ অথবা ধুলাবালির কারণে চাঁদ দেখা গেল না। যেহেতু তা শাবানের ২৯ তারিখ মনে করা হচ্ছিল। এ জন্যে ১লা রমযানকে লোক ৩০শে শাবান মনে করে বসলো এর ফলে অবহেলার কারণে রমযানের একটা রোযা নষ্ট হয়ে গেল।
হযরত আয়েশা (রা) বলেন, নবী (স) শাবান মাসের দিনগুলো ও তারিখগুলো যেমন চিন্তা ভাবনা ও হিসেবে করে মনে রাখতেন, অন্য কোনো মাসের তারিখ এতো যত্ন সহকারে মনে রাখতেন না, তারপর তিনি রমযানের চাঁদ দেখে রোযা রাখতেন। (আবু দাউদ)
৪. যে ব্যক্তি স্বচক্ষে রমযানের চাঁদ দেখবে, তার কর্তব্য হচ্ছে বস্তির সকল লোক অথবা মুসলমানদের দায়িত্বশীল ব্যক্তিদেরকে অথবা কোনো প্রতিষ্ঠানকে জানিয়ে দেয়া তা সে পুরুষ হোক বা নারী হোক।
৫. পশ্চিম আকাশ চাঁদ ওঠার স্থান যদি পরিষ্কার হয়, তাহলে এমন অবস্থায় শুধুমাত্র দুজন দীনদার লোকের সাক্ষ্যে রমযানের চাঁদ ওঠা প্রমাণিত হবে না আর না ঈদের চাঁদ প্রমাণিত হবে। এ অবস্থায় অন্তত এতজন লোকের সাক্ষ্য দরকার যাতে করে তাদের কথায় চাঁদ ওঠা সম্পর্কে নিশ্চয়তা লাভ করা যায়।
৬. চাঁদ ওঠার স্থান পরিষ্কার না হলে রমযানের নতুন চাদের প্রমাণের জন্যে শুধু একজনের সাক্ষ্যই যথেষ্ট তা সে পুরুষ হোক বা নারী। তবে নিম্নে শর্তে:
ক) সাক্ষ্যদাতা বালেগ, জ্ঞান সম্পন্ন এবং দীনদার মুসলমান হতে হবে।
খ) তাকে বলতে হবে যে, সে নিজ চক্ষে চাঁদ দেখেছে।
৭. আকাশ পরিষ্কার হলে ঈদের নতুন চাঁদের জন্যে একজনের সাক্ষ্য যথেষ্ট নয় সে যেমন ধরনের বিশ্বস্ত লোক হোক না কেন। ঈদের চাঁদের জন্যে প্রয়োজন দুজন দ্বীনদার মুত্তাকী পুরুষের সাক্ষ্য গ্রহণ করা অথবা একজন দ্বীনদার পুরুষ এবং দুজন দ্বীনদার নারীর সাক্ষ্য গ্রহণ করা। যদি চারজন স্ত্রীলোক সাক্ষ্য দেয় যে তারা চাঁদ দেখেছে তথাপি তার দ্বারা ঈদের চাঁদ প্রমাণিত হবে না।
৮. যেখানে কোনো মুসলমান কাযী অথবা শাসক নেই, সেখানকার মুসলমানদের উচিত নিজেরাই চাঁদ দেখার ব্যবস্থা করবে, তার প্রচার করবে এবং তদনুযায়ী কাজ করবে।
৯. সারা শহরে একথা ছড়িয়ে পড়লো যে, চাঁদ দেখা গেছে, কিন্তু বহু অনুসন্ধানের পরেও এমন কোনো ব্যক্তি পাওয়া গেল না যে একথা স্বীকার করবে, সে নিজে চাঁদ দেখেছে। এ অবস্থায় চাঁদ ওঠা প্রমাণিত হবে না।
১০. যদি এমন ব্যক্তি রমযানের চাঁদ দেখেছে বলে বলা হচ্ছে যার সাক্ষ্য শরিয়তের দৃষ্টিতে জায়েয নয়। এবং সে ছাড়া আর কেউ চাঁদ দেখেনি, তাহলে তার কথায় শহর বা বস্তির লোক রোযা রাখবে না। কিন্তু সে অবশ্যই রোযা রাখবে তার রোযা রাখা ওয়াজিব। তারপর তার ত্রিশ রোযা হয়ে গেলে এবং ঈদের চাঁদ দেখা গেল না, তখন সে ৩১ রোযা করবে এবং বস্তির লোকের সাথে ঈদ করবে।
১১. কোনো কারণে কোনো জায়গায় চাঁদ দেখা গেল না এবং অন্য স্থান থেকে চাঁদ দেখার খবর এল। যদি সে খবর শরীয়াতের দৃষ্টিতে গ্রহণযোগ্য হয় তাহলে তার দ্বারা রমযানের চাঁদও প্রমাণিত হবে। এবং ঈদের চাঁদও। মুসলমান দায়িত্বশীলদের প্রয়োজন হবে যে, তারা এসব খবর যাচাই করে দেখবে এবং শরীয়াত মুতাবেক যদি গ্রহণযোগ্য হয় তাহলে শহরে তার পাবলিসিটি করার এন্তেযাম করবে।
১২. দুজন নির্ভরযোগ্য ও বিশ্বস্ত লোকের সাক্ষ্য দানে চাঁদ দেখা যদি প্রমাণিত হয় এবং সে অনুযায়ী লোক রোযা রাখে, কিন্তু ৩০ রোযা পুরো হওয়ার পর ঈদের চাঁদ দেখা গেল না, তাহলে ৩১শে দিনে ঈদ করবে। সেদিন রোযা জায়েয হবে না।

Tuesday, February 21, 2017

রোযার বিবরণ ও ফযিলত

 রমজানের রোজা ইসলামের তৃতীয় গুরুত্বপূর্ণ স্তম্ভ। কুরআনে শুধু রোজা রাখার হুকুম দেওয়া হয়নি, বরঞ্চ রোজার নিয়ম পদ্ধতিও বলে দেওয়া হয়েছে। রমজানের মহত্ব ও বরকত সম্পর্কে আলোচনা করা হয়েছে। যে মাসের রোজা শরীয়ত ফরজ করেছে তার ফযিলত ও বরকত প্রথমে আমরা বর্ণনা করবো।
রমজানুল মুবারকের ফযিলত
কুরআনে রমজানের মহত্ব ও ফযিলত
কুরআন পাকে রমজানের মহত্ব ফযিলতের তিনটি কারণ বলা হয়েছেঃ
১. কুরআন নাযিল হওয়া অর্থাৎ এ মাসে কুরআন নাযিল হয়।
২. লায়লাতুল কদর। অর্থাৎ এ মাসে এমন এক রাত আছে যা মঙ্গল ও বরকতের দিক দিয়ে এক হাজার মাসের চেয়েও উত্তম।
৩. রোজা ফরজ হওয়া। অর্থাৎ এ মাসে মুসলমানদের ওপর রোজা ফরজ হয়েছে।
এসব ফযিলতের জন্য নবী (স) এ মাসকে ********** আরবী ************বা আল্লাহর মাস বলে আখ্যায়িত করেছেন এবং এ মাসকে সকল মাস থেকে উৎকৃষ্টতম বলেছেন। নিম্নে তার কিছু সংক্ষিপ্ত বিশ্লেষণ দেওয়া হলোঃ

রমজানের ফযিলতের কারণ

১. কুরআন নাযিল হওয়াঃ কুরআন বলেন-********** আরবী ************
রমজান এমন এক মাস যাতে কুরআন নাযিল হয়েছে- যা সমগ্র মানব জাতির জন্য হেদায়েতস্বরূপ। যা সত্য পথ প্রদর্শনকারী, সুস্পষ্ট শিক্ষার সাথে সংশ্লিষ্ট এবং হকও বাতিলকে সুস্পষ্ট করে উপস্থাপনকারী। (সূরা আল বাকারাঃ১৮৫)
রমজানের মহত্ব ফযিলত বুঝবার জন্য একথাই যথেষ্ট নয় যে, তার মধ্যে আল্লাহর হেদায়েতের সর্বশেষ কেতাব নাযিল করা হয়েছে। প্রকৃত ব্যাপার এই যে,মানবতা যদি হেদায়েতের উৎস থেকে বঞ্চিত হতো। তাহলে গোটা বিশ্ব প্রকৃতির অস্তিত্বের এ বিরাট কারখানাটির সূর্যের আলো ও চাঁদ তারার শুভ্র রশ্মি সত্ত্বেও লন্ড ভণ্ড হয়ে যেত।বিশ্ব প্রকৃতি তার সুনিপুণ কারুকার্য ও সৌন্দর্য সত্বেও অর্থহীন অপূর্ণ ও উদ্দেশ্যহীন হয়ে পড়তো। ফলে কুফর নাস্তিকতা শিরক ও সত্ত্বেও মানুষ বনের হিংস্র পশুর চেয়েও নিকৃষ্টতর হয়ে পড়তো। কুরআনও পৃথিবীতে হেদায়েতের আলোকের একমাত্র উৎস। এর থেকে যে বঞ্চিত সে সে হেদায়েত ও কল্যাণ থেকে বঞ্চিত।
২. লাইলাতুল কদরঃ কুরআনে সুস্পষ্টভাবে বর্ণিত আছে যে, তা রমজান মাসে শামিল করা হয়েছে এবং তা লাইলাতুল কদরে নাযিল করা হয়েছে। তার অনিবার্য অর্থ এই যে, লাইলাতুল কদর রমজানের কোনো একটি রাত যা হাজার মাসের চেয়েও উত্তম। হযরত আয়েশা (রা) বলেন, নবী (স) বলেছেনঃ রমজানের শেষ দশ বেজোড় রাতের রাতগুলোর মধ্যে লাইলাতুল কদর তালাশ কর। (বুখারী)
৩. রোজা ফরজ হওয়াঃ রোজার মত একটি গুরুত্বপূর্ণ ইবাদতের জন্য আল্লাহ তায়ালা এ মাসকে নির্ধারণ করেছেন এবং গোটা মাসের রোজা মুসলমানদের জন্য ফরজ করে দিয়েছেন:
********** আরবী ************ অতএব তোমাদের মধ্যে যে ব্যক্তি এ মাস পাবে তার জন্য অপরিহার্য যে সে পুরো মাস রোজা রাখবে।
রমজানের মহত্ব ও ফযিলত সম্পর্কে হাদীস
নবী (স) রমজানের মহত্ব ও ফযিলত বর্ণনা করতে গিয়ে বলেন যে, যখন রমজানের প্রথম রাত আসে, তখন শয়তান ও অবাধ্য জ্বিনগুলিকে শৃঙ্খল দিয়ে বেধে রাখা হয় এবং দোযখের সকল দরজা বন্ধ করে দেওয়া হয়। তার কোন একটি দরজাও খোলা রাখা হয় না। জান্নাতের সকল দরজা খুলে দেওয়া হয়। তার কোনো একটি দরজাও বন্ধ করে দেওয়া হয় না। তারপর আল্লাহর একজন আহ্বানকারী বলতে থাকে। যারা কল্যাণ ও মঙ্গল চাও তারা সামনের দিকে অগ্রসর হও। যারা বদকাম পাপাচার করতে চাও তারা থাম। তারপর আল্লাহর পক্ষ থেকে অনেক নাফরমান বান্দা কে দোযখ থেকে রেহাই দেওয়া হয়। আর এ কাজ রমজানের প্রত্যেক রাতেই করা হয়। (তিরমিযি,ইবনে মাযাহ)
  • এ এমন একটি মাস যে মসে মুমিনদের রুজি বৃদ্ধি করা হয়।(মিশকাত)
  • রমজান মাস সকল মাসের সরদার ।(ইলমুল ফেকাহ)
  • এ মাসের প্রথম অংশ রহমত, দ্বিতীয় অংশ মাগফেরাত, তৃতীয় এবং শেষ অংশ জাহান্নামের আগুন থেকে রেহাই ও মুক্তি।(মিশকাত)
  • এ মাসে যদি কেউ আল্লাহর সন্তুষ্টি অর্জনের জন্য আপন ইচ্ছায় কোন নফল নেকী করবে সে অন্যান্য মাসের ফরজ ইবাদতের সমান সওয়াব পাবে। আর যে একটি ফরজ আদায় করবে সে অন্যান্য মাসের সত্তরটি ফরজের সমান সওয়াবের হকদার হবে। (মিশকাত)
ইতিহাসে রমজানের মহত্ব ও গুরুত্ব
ইতিহাস এ কথার সাক্ষী যে, হক ও বাতিলের প্রথম সিদ্ধান্তকর যুদ্ধ এ মাসে হয়েছিল। এবং হক কে বাতিল থেকে আলাদা করে দেওয়ার যে দিন কে কুরআনে ইয়ামুল ফোরকান বলা হয়েছে তা ছিলো এ মাসের একটি দিন। এ দিনেই হকের প্রথম বিজয় সূচিত হয় এবং বাতিল পরাজিত হয়। ইতিহাস এ কথাও বলে যে, এ মাসেই মক্কা বিজয় হয়।এসব তথ্য সামনে রেখে চিন্তাভাবনা করুন তাহলে উপলব্ধি করবেন।
  • হকের হেদায়েত এ মাসেই নাযিল হয়।
  • ইসলামের প্রাথমিক বিজয় এ মাসেই হয়।
  • ইসলামের পরিপূর্ণ বিজয় এ মাসেই হয়।
এসব সত্য কে স্মরণ করিয়ে দেওয়ার জন্য রমজান মাস প্রতি বছর আসে। শরীয়ত এ মাসে রোজা ফরজ করেছে, রাতের নামাজ ও তেলাওয়াতে কুরআনের ব্যবস্থা করেছে যাতে করে মুমিনের মধ্যে জেহাদের প্রাণ শক্তি নিষ্প্রাণ না হয়ে পড়ে। এবং বছরের অন্তত একবার রমজান মাসে কুরআন শুনে বা পড়ে আপন পদমর্যাদায় দায়িত্বপূর্ণ অনুভূতি সহকারে মনের মধ্যে তরজমা করতে পারে।কুরআনের নাযিল হওয়া, তার অধ্যয়ন এবং রোজার মুজাহিদ সুলভ তরবিয়ত এ জন্য যে, ইসলামের সন্তানগণ দীনকে বিজয়ী ও প্রতিষ্ঠিত করার জন্যই জীবিত রয়েছে এবং কখনো যেন আপন দায়িত্ব ও কর্তব্য থেকে গাফিল না হয়।
রোজার অর্থ
রোজাকে আরবী ভাষায় সাওম বা সিয়াম বলে। তার অর্থ কোন কিছু থেকে বিরত থাকা এবং তা পরিত্যাগ করা। শরীয়তের পরিভাষায় সাওমের অর্থ
সুবহে সাদিক হতে সূর্যাস্ত পর্যন্ত খানা পিনা ও যৌন ক্রিয়াকর্ম থেকে বিরত থাকা।
রোজা ফরজ হওয়ার হুকুম
হিজরতের দেড় বছর পর রমজানের রোজা মুসলমানদের ওপর ফরজ করা হয়।
********** আরবী ************
হে ঈমানদারগণ তোমাদের উপর রোজা ফরজ করা হলো। রোজা ফরজে আইন যে তা অস্বীকার করবে সে কাফের এবং বিনা ওজরে যে রাখবে না সে ফাসেক ও কঠিন গোনাহগার হবে।
রোজার গুরুত্ব
কুরআন এ সাক্ষ্য দেয় যে, সকল আসমানী শরীয়তের অধীন রোজা ফরজ ছিলো। এবং প্রত্যেক উম্মতের ইবাদতের মধ্যে তা ছিল একটা অপরিহার্য অংশ।
********** আরবী ************
যেমন রোজা ফরজ করা হয়েছিলো তোমাদের পূর্ববর্তী লোকদের উপর।
এ আয়াত শুধু একটা ঐতিহাসিক ঘটনা বর্ণনার জন্য নয়, বরঞ্চ এ গুরুত্বপূর্ণ সত্যটি তুলে ধরার জন্য যে মানুষের প্রবৃত্তির পরিশুদ্ধির সাথে রোজার বিশেষ সম্পর্ক রয়েছে। এবং তাযকিয়ায়ে নফসে তার তার একটা স্বাভাবিক অধিকার রয়েছে। বরঞ্চ এমন মনে হয় যে, তরবিয়ত ও তাযকিয়ার প্রক্রিয়া ছাড়া তা পূর্ণ হতে পারে না। অন্য কোন ইবাদত তার বিকল্প হতেই পারে না।এজন্যই রোজা সকল নবী গনের শরীয়াতে ফরজ ছিল।
রোজার গুরুত্ব বর্ণনা করতে গিয়ে নবী (স) বলেন যে ব্যক্তি কোন শরয়ী ওজর অথবা রোগ ছাড়া রমজানের একটি রোজা ছেড়ে দেবে যদি সে সারা জীবন ধরে রোজা রাখে তবুও তার ক্ষতি পূরন হবে না। (আহমদ, তিরমিযি, আবু দাউদ)
অর্থাৎ রমজানের রোজার মহত্ব, কল্যাণ, বরকত ও গুরুত্ব এইযে, যদি কোন উদাসীন ব্যক্তি স্বেচ্ছায় কোন রোজা নষ্ট করে বা না রাখে, তার ফলে তার যে ক্ষতি হলো তা জীবনব্যাপী রোজা রাখলেও তার ক্ষতিপূরণ হবে না। তবে তার আইনগত কাযা হতে পারে।
রোযার উদ্দেশ্য
রোযার প্রকৃত উদ্দেশ্য হচ্ছে তাকওয়া পয়দা করার ……. আরবী …… যাতে করে তোমাদের মধ্যে তাকওয়া পয়দা হতে পারে। তাকওয়া আসলে এমন এক সম্পদ যা আল্লাহর মহব্বত ও ভয় থেকে পয়দা হয়। আল্লাহর সত্তার ওপর ঈমান,ও তার গুণাবলী দয়া অনুগ্রহের গভীর অনুভূতি থেকে মহব্বতের প্রেরণা সৃষ্টি হয় এবং তা অন্য গুণ রাগ, ক্ষোভ ও শাস্তিদানের ক্ষমতার ধারণা বিশ্বাস থেকে ভয়ের অনুভূতি জাগ্রত হয়। মহব্বত ও ভয়ের এ মানসিক অবস্থার নাম তাকওয়া যা সকল নেক কাজের উৎস এবং সকল পাপ কাজ থেকে বাচার সত্যিকার উপায়।
রোযা আল্লাহর সত্তার ওপরে দৃঢ় বিশ্বাস এবং তার অনুগ্রহ ও অসন্তোষের গভীর অনুভূতি সৃষ্টি করে। সারাদিন ক্রমাগত কয়েক ঘণ্টা ধরে প্রবৃত্তির একেবারে মৌলিক ও প্রয়োজনীয় দাবী পূরণ থেকে বিরত থাকার কারণে মানুষের ওপর এ প্রভাব পড়ে যে, সে চরম অক্ষম, অসহায় ও মুখাপেক্ষী হয়। সে জীবনের প্রতি মূহুর্তের জন্য আল্লাহর রহম ও করমের ভিখারি হয়। তারপর সে যখন তার জীবনকে আল্লাহর নিয়ামতে সমৃদ্ধ দেখতে পায়, তখন সে আল্লাহর মহব্বতের আবেগ উচ্ছ্বাসে উদ্বুদ্ধ হয় এবং আন্তরিক আগ্রহ সহকারে আল্লাহর আনুগত্য ও বন্দেগীতে তৎপর হয় তখন সে নিভৃতে তার প্রবল যৌন বাসনাকে সংযত করে রাখে যেখানে আল্লাহ ছাড়া দেখার কেউ থাকে না তখন তার মনে আল্লাহর ভয় তীব্র থেকে তীব্রতর হয়। ফলে তার মনের ওপর আল্লাহর মহত্ব ও শ্রেষ্ঠত্বের এমন ছাপ পড়ে যে গোনাহের চিন্তা করতেও তার শরীর কেপে ওঠে।
প্রকৃত রোযা
রোযার এ মহান উদ্দেশ্য তখনই হাসির করা যেতে পারে, যখন রোযা পূর্ণ অনুভূতির সাথে রাখা হয় এবং ঐ নিষিদ্ধ কাজ থেকে রোযাকে রক্ষা করা হয় যার প্রভাবে রোযা প্রাণ হীন হয়ে পড়ে। প্রকৃত রোযা তো তাই যার সাহায্যে মানুষ তার মন মস্তিষ্ক ও সকল যোগ্যতাকে আল্লাহর নাফরমানি থেকে বাঁচিয়ে রাখবে এবং প্রবৃত্তির চাহিদা পদদলিত করবে।
নবী (স) বলেন, তুমি যখন রোযা রাখবে তখন তোমার কর্তব্য হবে তোমার কান, চোখ, মুখ, হাত, পা এবং সকল অঙ্গ প্রত্যঙ্গকে আল্লাহর অপছন্দনীয় কাজ থেকে বিরত রাখা। (কাশফুল মাহজুব)
নবী (স) আরো বলেন, যে ব্যক্তি রোযা রেখে মিথ্যা কথা বলা এবং মিথ্যা আচরণ থেকে বিরত হলো না, তার ক্ষুধার্ত ও তৃষ্ণার্ত থাকার আল্লাহর কোনো প্রয়োজন ছিল না। (বুখারী)
এমন বহু রোজাদার আছে যে, রোযায় ক্ষুধা তৃষ্ণা ভোগ করা ছাড়া তাদের নেকীর পাল্লায় আর কিছু পড়ে না। (মিশকাত)

Wednesday, January 25, 2017

কাফফারার মাসায়েল


রমযানের রোযা নষ্ট হয়ে গেলে তার কাফফারা এই যে, ক্রমাগত ষাট দিন রোযা রাখতে হবে। মাঝে কোনো রোযা ছুটে গেলে আবার নতুন করে ক্রমাগত ষাট রোযা রাখতে হবে। মাঝে যে রোযা ছুটে গেছে তা হিসেবের মধ্যে গণ্য হবে না।
কোনো কারণে কেউ রোযা রাখতে না পারলে ষাটজন অভাবগ্রস্তকে দু বেলা পেট ভরে খাওয়াতে হবে।
১. মেয়েদের জন্যে কাফফারা এ সুবিধা আছে যে, হায়েযের জন্যে মাঝে রোযা বাদ পড়লে ধারাবাহিকতা নষ্ট হবে না। তবে হায়েয বন্ধ হওয়ার সাথে সাথে রোযা শুরু করতে হবে।
২. কাফফারা রোযা রাখার সময় যদি নেফাসের অবস্থায় হয় তাহলে ধারাবাহিকতা নষ্ট হবে। আবার নতুন করে ষাট রোযা রাখতে হবে।
৩. কাফফরা রোযা রাখার সময় যদি রমযান মাস এসে যায় তাহলে রমযানের রোযা রাখতে হবে। তারপর পুনরায় এক সাথে ষাট রাখতে হবে।
৪. যদি একই রমযানে একাধিক রোযা নষ্ট হয় তাহলে সব নষ্ট রোযার জন্যে একই কাফফারা ওয়াজিব হবে।
৫. কারো ওপর একটি কাফফারা ওয়াজিব হয়েছে। এ আদায় করার পূর্বে আর এক কাফফারা ওয়াজিব হলো। তাহলে দুয়ের জন্যে একই কাফফারা ওয়াজিব হবে তা এ দুটি কাফফারা দুটি রমযানের হোক না কেন। শর্ত এই যে, যৌনক্রিয়ার কারণে যদি রোযা নষ্ট না হয়ে থাকে। যৌনক্রিয়ার কারণে যতো রোযা নষ্ট হবে তার প্রত্যেকটির জন্যে আলাদা আলাদা কাফফারা ওয়াজিব হবে।
৬. ষাটজন দুঃস্থ লোকের ব্যাপারে এটা লক্ষ্য রাখতে হবে যে, তারা পূর্ণ বয়স্ক হতে হবে, ছোট বালককে খানা খাওয়ালে তার বদলায় পুনরায় বয়স্ক দুঃস্থকে খাওয়াতে হবে।
৭. খানা খাওয়ানোর পরিবর্তে খাদ্য শস্য দেয়াও জায়েয। অথবা তার মূল্যও দিয়ে দেয়া যায়।
৮. দুঃস্থদের খাওয়ানোর ব্যাপারে সাধারণ মানের খাদ্য হতে হবে- না খুব ভালো, না খারাপ।
৯. দুঃস্থদের খাওয়াবার ব্যাপারে ধারাবাহিকতা রক্ষা না করলে কোনো ক্ষতি নেই কাফফারা হয়ে যাবে।
১০. একই ব্যক্তিকে ষাটদিন খাওয়ালে সহীহ হবে না- খাদ্য শস্য বা তার মূল্য দেয়ার ব্যাপারেও তাই।
ফিদিয়া
কেউ যদি বার্ধক্যের কারণে খুবই দুর্বল হয়ে পড়ে অথবা এমন কঠিন পীড়ায় ভুগছে যে, বাহ্যত সুস্থ হওয়ার আশা নেই এবং তার রোযা রাখার শক্তি নেই। এমন অবস্থায় শায়িত এ ধরনের লোকের জন্যে রোযা না রাখার অনুমতি দিয়েছে। প্রত্যেক রোযার বদলে এক একজন দুঃস্থকে ফিদিয়া দেবে। ফিদিয়ার মধ্যে খানাও খাওয়ানো যেতে পারে, পরিমাণ মতো খাদ্য শস্যও দেয়া যেতে পারে অথবা তার মূল্যও দেয়া যেতে পারে।
ফিদিয়ার পরিমাণ
একজন ফকীরকে সাদকায়ে ফিতরের পরিমাণ খাদ্য শস্য দেয়া অথবা তার মূল্য দেয়া। প্রত্যেক রোযার বদলায় দু বেলা কোনো অভাবগ্রস্তকে খানা খাওয়ানোও দুরস্ত আছে। মধ্যম ধরনের খানা খাওয়াতে হবে।
ফিদিয়ার মাসায়েল
১. ফিদিয়া আদায় করা সত্ত্বেও যদি রোগী স্বাস্থ্যবান হয়ে যায় তাহলে রোযাগুলোর কাযা ওয়াজিব হবে। যে ফিদিয়া দেয়া হয়েছে তার আলাদা সওয়াব আল্লাহ দেবেন।
২. কারো জিম্মায় কিছু কাযা রোযা আছে। মৃত্যুর সময় সে অসিয়ত করে গেল যে, তার মাল থেকে যেন ফিদিয়া দিয়ে দেয়া হয়। কাযা রোযার মোট ফিদিয়া যদি তার এ পরিত্যক্ত মালের এক তৃতীয়াংশের পরিমাণ হয় (পরিত্যক্ত মাল বলতে বুঝায় যা দাফন কাফনের ব্যয় ভার বহন এবং ঋণ থাকলে তা পরিশোধ করার পর যা বাচে। তার এক তৃতীয়াংশ।) তাহলে ফিদিয়া ওয়াজিব হবে। ফিদিয়ার মূল্য যদি অধিক হয় আর এক তৃতীয়াংশের মালের পরিমাণ কম হয়, তাহলে এক তৃতীয়াংশ মালের বেশী ফিদিয়া তখন জায়েয হবে যখন ওয়ারিশগণ খুশী হয়ে রাযী হবে। নাবালেগ বাচ্চাদের অনুমতির কোনো প্রয়োজন নেই।
৩. মৃত ব্যক্তি যদি অসিয়ত করে না থাকে এবং ওয়ারিশগণ আপন ইচ্ছায় যদি ফিদিয়া আদায় করে তাহলেও দুরস্ত হবে। আশা করা যায় যে, আল্লাহ তায়ালা ফিদিয়া কবুল করবেন।
৪. প্রতি ওয়াক্তের নামাযের ফিদিয়াও তাই যা রোযার ফিদিয়া। মনে রাখতে হবে দিনে পাঁচ ওয়াক্তের নামায এবং তার সাথে বেতের নামায অর্থাৎ দৈনিক ছয় নামায।
৫. মৃত্যুর সময় কেউ নামাযের জন্যে ফিদিয়া দেয়ার অসিয়ত করলে তার হুকুম রোযার ফিদিয়ার মতোই হবো।
৬. মৃত ব্যক্তি পক্ষ থেকে তার ওয়ারিশ যদি নামায পড়ে বা রোযা রাখে, তাহলে তা দুরস্ত হবে না।
৭. সামান্য অসুখের জন্যে রমযানের রোযা কাযা করা অথবা এ ধারণা করা যে পরে কাযা আদায় করবে অথবা ফিদিয়া দিয়ে মনে করবে যে, রোযার হক আদায় হয়েছে এমন মনে করা ঠিক নয়।
নবী (স) বলেন, যদি কেউ বিনা ওজরে অথবা রোগের কারণ ছাড়া একটা রোযাও ছেড়ে দেবে- সারা জীবন রোযা রাখলেও তার ক্ষতি পূরণ হবে না। (তিরমিযি, আবু দাউদ)
রোযার বিভিন্ন হুকুম ও নিয়মনীতি
১. যে ব্যক্তি কোনো কারণে রোযা রাখতে পারলো না তার জন্যে এটা জরুরী যে, সে যেন প্রকাশ্যে খানাপিনা না করে এবং বাহ্যত রোযাদারের মতো হয়ে থাকে।
২. যার মধ্যে রোযা ফরয হওয়া ও সহীহ হওয়ার সকল শর্ত পাওয়া যায়, তার রোযা যদি কোনো কারণে নষ্ট হয়ে যায়, তাহলে তার জন্যে ওয়াজিব যে, সে দিনে বাকী অংশ রোযাদারের মতো হয়ে থাকবে এবং খানাপিনা ও যৌনক্রিয়া থেকে বিরত থাকবে।
৩. কোনো মুসাফির যদি দুপুরের পর বাড়ী পৌঁছে অথবা কোথাও মুকীম হওয়ার এরাদা করে তাহলে দিনের বাকী অংশ রোযাদারের মতো হয়ে থাকা এবং খানাপিনা থেকে বিরত থাকা তার জন্যে মুস্তাহাব হবে। এমনিভাবে কোনো স্ত্রীলোক যদি দুপুরের পর হায়েয বা নেফাস থেকে পাক হয় তাহলে তার জন্যেও মুস্তাহাব যে, সে দিনের বাকী অংশ খানাপিনা থেকে বিরত থাকবে।
৪. যদি কেউ ইচ্ছা করে রোযা নষ্ট করে অথবা কেউ রাত আছে মনে করে সুবেহ সাদেকের পর খানা খায়, তাহলে তার জন্যে ওয়াজিব হবে সারাদিন রোযাদারের মতো কাটানো এবং খানাপিনা থেকে বিরত থাকা।
৫. দুপুরের পর যদি কোনো শিশু বালেগ হয় অথবা কেউ যদি মুসলমান হয়, তাহলে তাদের জন্যে মুস্তাহাব এই যে, তারা বাকী দিনটুকু রোযাদারের মতো কাটাবে।
৬. রোযা রাখার পর যদি কোনো মেয়ে মানুষের হায়েয শুরু হয় তাহলে রোযা নষ্ট হবে। কিন্তু তারপর তার উচিত রোযাদারের মতো খানাপিনা থেকে বিরত থাকা।

Wednesday, January 18, 2017

যেসব অবস্থায় রোযা ভাঙা জায়েয


১. হঠাৎ সংজ্ঞাহীন হয়ে পড়েছে, এমন কোনো রোগ যার ফলে জীবন বিপদাপন্ন অথবা মোটর দুর্ঘটনায় আহত, উঁচু জায়গা থেকে পড়ে অবস্থা আশংকাজনক এমন অবস্থায় রোযা ভাঙা জায়েয।
২. কেউ হঠাৎ অসুস্থ হয়ে পড়েছে এবং জীবনের আশংকা নেই কিন্তু আশংকা যে রোযা যদি ভাঙা না হয় তাহলে রোগ খুব বেড়ে যাবে, এমন অবস্থায় রোযা ভাঙার অনুমতি আছে।
৩. কারও এমন প্রচন্ড ক্ষুধা তৃষ্ণা লেগেছে যে, কিছু পানাহার না করলে জীবন যাওয়ার আশংকা রয়েছে, তাহলে এমন অবস্থায় রোযা ভাঙা দুরস্ত আছে।
৪. কোনো গর্ভবতী মেয়েলোকের এমন দুর্ঘটনা হলো যে, তার নিজের অথবা পেটের বাচ্চার জীবনের আশংকা হলো, এমন অবস্থায় রোযা ভাঙার এখতিয়ার আছে।
৫. কাউকে সাপে দংশন করেছে এবং তাৎক্ষনিকভাবে ওষুধ পত্রের প্রয়োজন। এমন অবস্থায় রোযা ভাঙা উচিত।
৬. দুর্বলতা থাকা সত্ত্বেও সাহস করে রোযা রাখা হলো। তারপর মনে হলো যে, যদি রোযা ভাঙা না হয় তাহলে জীবনের আশংকা রয়েছে, অথবা সাংঘাতিকভাবে রোগ বেড়ে যেতে পারে। এমন অবস্থায় রোযা ভাঙার অনুমতি আছে।
কাযা রোযার মাসায়েল
১. রমযানের যেসব রোযা কোনো কারণে করা হয়নি, তার কাযা আদায় করতে অযথা বিলম্ব করা উচিত নয়। যতো শীঘ্র করা যায় ততোই ভালো।
২. রমযানের রোযা হোক বা অন্য কোনো রোযা, তা ক্রমাগত করা জরুরী নয়। এটাও জরুরী নয় যে, ওজর শেষ হওয়ার সাথে সাথেই করতে হবে। সুযোগ মতো কাযা আদায় করলেই চলবে।
৩. রোযার কাযা ক্রমানুসারে করা ফরয নয়। যেমন কাযা রোযা না করেও রমযানের চলতি রোযা করা যায়।
৪. কাযা রোযা রাখার জন্যে দিন তারিখ নির্দিষ্ট করা জরুরী নয়। যতো রোযা কাযা হয়েছে তার বদলার ততোগুলো রোযা রাখতে হবে।
৫. যদি রমযানের দু বছরের রোযা কাযা পড়ে থাকে, তাহলে কোন বছরের কাযা আদায় করা হচ্ছে তা নির্দিষ্ট হওয়া জরুরী। এজন্যে এ নিয়ত করতে হবে যে, অমুক বছরের কাযা রোযা রাখা হচ্ছে।
৬. কাযা রোযা রাখার জন্যে রাতেই নিয়ত করা জরুরী। সুবেহ সাদেকের পর কাযা রোযার নিয়ত করলে তা দুরস্ত হবে না। সে রোযা নফল হয়ে যাবে। কাযা রোযা পুনরায় রাখতে হবে।
৭. রমযানের কিছু রোযা কাযা হয়ে গেল। এ কাযা রোযা রাখার সুযোগ পাওয়া গেল না এবং আর এক রমযান এসে গেল। তাহলে প্রথমে রমযানের রোযা রাখতে হবে, কাযা রোযা পরে রাখবে।
৮. কেউ সন্দেহে দিনে রমযানের রোযা রাখলো। পরে জানা গেল যে, সেদিন শাবানের ৩০ তারিখ। তাহলে এ রোযা নফল হয়ে যাবে যদিও তা মাকরূহ হবে। আর যদি সে রোযা ভেঙে ফেলা হয় তো তার কাযা ওয়াজিব হবে না।

Tuesday, January 17, 2017

যেসব ওজরের কারণে রোযা না রাখার অনুমতি আছে

যেসব ওজরের কারণে রোযা না রাখার অনুমতি আছে তা হলো দশটি। তার বিবরণ নিম্নরূপ:
(১) সফর, (২) রোগ (৩) গর্ভধারণ (৪) স্তন্যদান (৫) ক্ষুধা তৃষ্ণার প্রাবল্য (৬) বার্ধক্য ও দুর্বলতা (৭) জীবন নাশের ভয় (৮) জেহাদ (৯) বেহুঁশ হওয়া (১০) মম্তিষ্ক বিকৃতি।
১। সফর
শরীয়াত তার যাবতীয় হুকুমের মধ্যে বান্দাহর সহজসাধ্যতার প্রতি লক্ষ্য রেখেছে। কোনো ব্যাপারেও তাকে অযথা কষ্ট ও সংকীর্ণতার সম্মুখীন করা হয়নি। বস্তুত কুরআন পাকে রোযা ফরয হওয়ার বিষয়টি ঘোষণা করতে গিয়ে মুসাফির ও রোগীর অক্ষমতার প্রতি লক্ষ্য রাখা হয়েছে এবং রোযা না রাখার অনুমতি দেয়া হয়েছে।
*******আরবী*********
অতএব তোমাদের মধ্যে যে কেউ এ মাস পাবে তার জন্যে অপরিহার্য যে, সে যেন রোযা রাখে। আর যে ব্যক্তি রোগী অথবা সফরে আছে, সে অন্যান্য দিনে রোযা রেখে তার হিসেব পুরো করবে। (সূরা আল বাকারাঃ ১৮৫)
১. সফর যে কোনো উদ্দেশ্যেই হোক না কেন, এবং তার মধ্যে সকল প্রকার সুযোগ সুবিধা থাক অথবা দুঃখ কষ্ট সহ্য করতে হোক, সকল অবস্থায় মুসাফিরের রোযা না রাখার অনুমতি আছে। অবশ্যই যে সফরে কোনো অসুবিধা নেই, তাতে রোযা রাখাই মুস্তাহাব যাতে করে রমযানের ফযিলত ও বরকত লাভ করা যায়। কিন্তু পেরেশানি ও অসুবিধা হলে রোযা না রাখা ভালো।
২. যদি রোযার নিয়ত করার পর অথবা রোযা শুরু হয়ে যাওয়ার পর কেউ সফরে রওয়ানা হয়। তাহলে সেদিনের রোযা কাযা জরুরী। কিন্তু রোযা ভেঙে দিলে কাফফারা দিতে হবে না।
৩. যদি কোনো মুসাফির দুপুরের আগে কোথাও মুকীম হয়ে যায় এবং ঐ সময় পর্যন্ত রোযা নষ্ট হয় এমন কোনো কাজ সে করেনি, তাহলে তার জন্যেও সেদিন রোযা রাখা জরুরী, কিন্তু রোযা নষ্ট করলে কাফফারা দিতে হবে না।
৪. যদি কোনো মুসাফির কোনো স্থানে মুকীম হওয়ার ইরাদা করে, ১৫দিনের কমই ইরাদা করুক না কেন, তথাপি তার উচিত যে, সে রোযা রাখে, এ দিনগুলোতে রোযা না রাখা মাকরূহ। আর যদি ১৫ দিন থাকার ইরাদা করে তাহরে তো রোযা না রাখা জায়েয নয়।
২। রোগ
১.যদি রোযা রাখার কারণে কোনো রোগ সৃষ্টির আশংকা হয় অথবা এ ধারণা হয় যে, ওষুধ না পাওয়ার কারণে অথবা আহার না পাওয়ার কারণে রোগ বেড়ে যাবে, অথবা যদি এ ধারণা হয় যে, স্বাস্থ্য বিলম্বে লাভ হবে তাহলে এসব অবস্থায় রোযা না রাখার অনুমতি আছে। কিন্তু জেনে রাখা দরকার যে, এমন ধারণা করার সংগত কারণ থাকতে হবে। যেমন ধরুন, কোনো নেক ও অভিজ্ঞ চিকিৎসক পরামর্শ দেয় অথবা নিজের বার বার অভিজ্ঞতা হয়েছে অথবা প্রবল সম্ভাবনা থাকে। নিছক অমূলক ধারণার ভিত্তিতে রোযা না রাখা জায়েয নয়।
২. যদি কারো নিজের নিছক এ ধারণা হয় যে সম্ভবত রোযা রাখলে রোগ সৃষ্টি হবে অথবা বেড়ে যাবে যার কোনো পূর্ব অভিজ্ঞতা নেই, অথবা কোনো অভিজ্ঞ ডাক্তার বা হেকীমের পরামর্শ নেয়া হয়নি এবং রোযা রাখা হলো না, তাহলে গোনাহগার হবে এবং তার কাফফারাও দিতে হবে।
৩. কোনো বেদীন চিকিৎসক, যে শরীয়াতের মর্যাদা ও গুরুত্ব অনুভব করে না, তার পরামর্শ অনুযায়ী চলাও ঠিক নয়।
৩। গর্ভ
১. যদি কোনো স্ত্রীলোকের প্রবল ধারণা হয় যে, রোযা রাখলে তার পেটের সন্তানের ক্ষতি হবে অথবা স্বয়ং তার ক্ষতি হবে, তাহলে তার জন্যে রোযা না রাখার অনুমতি আছে।
২. যদি রোযার নিয়ত করার পর কোনো মেয়ে মানুষ জানতে পারে যে, তার গর্ভসঞ্চার হয়েছে এবং তার সুস্পষ্ট ধারণা হয় যে, রোযা রাখলে তার ক্ষতি হবে তাহলে তার জন্যে এ অনুমতি আছে যে, সে রোযা ভেঙে ফেলবে। তারপর কাযা করবে। তার কাফফারা দিতে হবে না।
৪। স্তন্যদান
১. রোযা রেখে স্তন্যদান যদি প্রবল ধারণা হয় যে, প্রসূতির ভয়ানক ক্ষতি হবে, যেমন দুধ শুকিয়ে যাবে এবং বাচ্চা ক্ষুধায় ছটফট করবে অথবা তার জীবনেই আশংকা হয়, তাহলে তার রোযা না রাখার অনুমতি আছে।
২. যদি পারিশ্রমিক দিয়ে দুধ খাওয়ানো যেতে পারে এবং বাচ্চাও যদি অন্য কারো দুধ খায়, তাহলে রোযা না রাখার দুরস্ত নয়, আর যদি বাচ্চা অন্য কারো দুধ খেতেই চায় না, তাহলে রোযা না রাখার জায়েয আছে।
৩. পারিশ্রমিক নিয়ে যে দুধ খাওয়ায়, তারও যদি এ প্রবল ধারণা হয় যে, রোযা রাখার কারণে তার বাচ্চা অথবা স্বয়ং তার ক্ষতি হবে, তাহলে সে রোযা ছেড়ে দিতে পারে।
৪. কোনো মেয়ে মানুষ ঠিক রমযানের দিনেই দুধ খাওয়ানোর কাজ শুরু করলো। ঐ দিন যদি সে রোযার নিয়তও করে থাকে তবুও তার রোযা না রাখা জায়েজ। রোযা ভাঙ্গার জন্য কাযা করতে হবে, কাফফারা ওয়াজিব হবে না।
৫। ক্ষুধা-তৃষ্ণার তীব্রতা
কোনো ব্যক্তি রোগী তো নয়, কিন্তু রোগের কারণে এতোটা দুর্বল হয়েছে যে, রোযা রাখলে পুনরায় অসুস্থ হওয়ার প্রবল আশংকা রয়েছে, তাহলে তার জন্যে রোযা না রাখার অনুমতি আছে।
৬। দুর্বলতা ও বার্ধক্য
কোনো ব্যক্তি বার্ধক্যের কারণে অত্যন্ত দুর্বল হয়ে পড়েছে। তার জন্যে অনুমতি আছে যে,সে রোযা রাখবে না। আর এমন ব্যক্তির সম্পর্কে এ আশা তো করা যায় না যে, সুস্থ হয়ে কাযা করবে। এজন্যে তার ওয়াজিব যে, সে রোযার ফিদিয়া দেবে তখনই দিক বা পরে। ফিদিয়ার পরিমাণ সাদকায়ে ফিতরের সমান।
৭। জীবনের আশংকা
যদি কঠোর পরিশ্রমের কারণে জীবনের আশংকা হয় অথবা কেউ যদি এ বলে বাধ্য করে যে, রোযা রাখলে তাকে মেরে ফেলবে, অথবা নিষ্ঠুরভাবে মারপিট করবে অথবা কোনো অঙ্গ কেটে দেবে, তাহলে এমন ব্যক্তির জন্যেও রোযা না রাখার অনুমতি আছে।
৮। জিহাদ
দীনের দুশমনের বিরুদ্ধে জিহাদের নিয়ত আছে এবং এ ধারণা হয় যে, রোযা রাখলে দুর্বল হয়ে পড়বে তাহলে রোযা না রাখার  অনুমতি আছে।
*কার্যত জেহাদ চলছে তখনও রোযা না রাখার অনুমতি আছে।
*কার্যত জেহাদ চলছে না, কিন্তু শীঘ্রই সংঘর্ষের আশংকা রয়েছে, এমন অবস্থায়ও অনুমতি আছে।
*রোযা রাখার পর যদি এমন অবস্থার সম্মুখীন হয় তাহলেও রোযা ভেঙ্গে ফেলার অনুমতি আছে। তার জন্যে কাফফারা দিতে হবে না।
৯। হুশ না থাকা
কেউ যদি বেহুশ হয়ে যায় এবং কয়েকদিন ধরে বেহুশ থাকে, এ অবস্থায় যেসব রোযা রাখা হবে তার কাযা ওয়াজিব হবে। তবে যে রাতে সে বেহুশ হয়েছে তার পরদিন যদি তার দ্বারা এমন কোনো কাজ না হয় যার দ্বারা রোযা নষ্ট হয় এবং এটাও যদি জানা যায় যে, সে রোযার নিয়ত করেছে বা করেনি, তাহলে সেদিন তার রোযা ধরা হবে এবং তার কাযা করতে হবে না। অবশ্যই পরের দিনগুলোর কাযা করতে হবে।
১০। মস্তিষ্ক বিকৃত হওয়া
যদি কেউ পাগল হয়ে পড়ে এবং রোযা রাখতে না পারে তাহলে তার দুটি উপায় রয়েছেঃ
এক – কোনো সময়েই পাগলামি ভালো হচ্ছে না। এমন অবস্থায় রোযা বিলকুল মাফ-কাযা ফিদিয়া কিছুই দরকার নেই।
দুই – কোনো সময়ে পাগলামি ভালো হয়ে যাচ্ছে তাহলে এ অবস্থায় কাযা করতে হবে।